একুশের লড়াইটা বামেরা আসলে হেরেছে উনিশের লোকসভা ভোটেই

153

একুশের লড়াইটা বামেরা আসলে হেরেছে উনিশের লোকসভা ভোটেই| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaঅতনু বিশ্বাস

প্রথমেই বলে রাখা যাক, বিধানসভার ভোটে বামেদের বিপর্যয়ে যারা অবাক হয়েছেন আমি সে দলে নই। স্বাধীন ভারতে এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বাম বিধায়ক সংখ্যা শূন্য হল, নাকি এক-আধজন বাম বিধায়ক রইলেন সেখানে, তা খুবই প্রতীকী বলে মনে হয় আমার। বাস্তবে তাতে গুরুত্বের বড় একটা হেরফের হয় না। এবারের ভোটে বামেদের মোট ভোটের শতাংশ সাড়ে পাঁচের কাছাকাছি, এটাই আসল কথা।

- Advertisement -

জোট হওয়ার ফলে বামেরা অনেক আসনে প্রার্থী দেয়নি, এ যুক্তি অনেকে দিচ্ছেন বটে, তবে জোট না হলে যে আসনগুলোতে বামপ্রার্থী ছিলেন, সেখানে তাদের ভোট কমত আরও। পরিস্থিতি মোটামুটি একই হত বলে আমার ধারণা।

২৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডে জনসমাবেশ এবং টুম্পা সোনা গানের প্যারোডি বিপুল প্রচার পাওয়ায় বামেদের প্রত্যাশার বেলুনের আয়তন বেড়েছিল। এখন অবশ্য আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করাই বামেদের এবারের বিপর্যয়ের প্রধান কারণ বলে সহজেই দাগিয়ে দিচ্ছেন অনেকে। এমনকি অনেক বাম নেতাও। এটা ঠিকই যে, এই জোটকে হয়তো ভালোভাবে নেননি অনেক বামভোটার। তবু এই জোট না হলেই যে বামভোটে জোয়ার আসত একুশের ভোটে, সেটা মনে করারও খুব একটা কারণ দেখি না।

আসলে একুশের লড়াইটা বামেরা আসলে হেরে বসেছে উনিশের লোকসভা নির্বাচনেই। ২০১১-তে পরিবর্তনের ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বামেদের মোট ভোট ছিল প্রায় ৪১ শতাংশ। যে কোনও মানদণ্ডেই সেটা এক বিপুল সমর্থন। সেখান থেকে দায়িত্বশীল বিরোধীর ভূমিকা পালন করে বামেরা আবার ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাতে পারত অবশ্যই। অবশ্য এর মাঝে বিজেপির মতো একটা দল প্রবলভাবে ঢুকে পড়েছে বাংলার রাজনীতিতে, যারা কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে গত সাত বছর। আর এটাও ঠিক যে, গ্রামীণ বাংলার সমাজ মূলত রাজনীতি-নির্ভর বা আরও ভালোভাবে বললে মূলত দলীয় রাজনীতি-নির্ভর। দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য যাকে বলেছেন পার্টি-সোসাইটি। ক্ষমতা যাওয়ার আগেই গ্রাম-বাংলার রাজনীতির রাশ বামেদের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তাদের সেই রাজনৈতিক অসহায়তা আরও প্রকট হয়েছে ২০১১-র পর থেকে।

ফরাসি সমাজতত্ত্ববিদ মরিস ডুভারজের বিখ্যাত ডুভারজেস ল গড়ে উঠেছে গত শতকের পাঁচ এবং ছয়ের দশকে। এই তত্ত্ব অনুসারে, ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট নির্বাচনের ফলশ্রুতি হল- ক্রমে দুই দলীয় সিস্টেমের দিকে এগিয়ে চলা। ভোটাররা প্রায়শই এমন প্রার্থীকে বেছে নেন যার জেতার সম্ভাবনা সবচাইতে বেশি। তাই ক্রমেই হারিয়ে যেতে থাকে ছোট দলগুলি। লড়াইটা দুই শীর্ষ দলের মধ্যে হওয়াটাই হয়ে পড়ে ভবিতব্য। এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হল, ভোটাররা ভোট দেন কৌশলগতভাবেই, তাই নিজস্ব পছন্দের প্রার্থীর চেয়ে যার জেতার সম্ভাবনা বেশি, তার দিকেই ঝুঁকে পড়েন ভোটাররা। একে ভোটারদের ব্যান্ডওয়াগনের অংশীদার হওয়ার প্রবণতা বলা চলে। কিন্তু এই মানসিকতা ছোট দলগুলির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয় আরও। ভোটাররা যে শুধু তাঁদের নির্বাচনি কেন্দ্রে কোনও দলের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবেন, তা কিন্তু নয়। কারা সরকার গড়তে পারে, প্রাধান্য পায় সেটাও।

ভালোভাবে দেখলে বোঝা যাবে, আমাদের দেশের বেশিরভাগ রাজ্যে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, রাজনীতি মূলত দুই দল বা জোটকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে আসছে। তৃতীয় শক্তি অনেক ক্ষেত্রেই কোনও বিচ্ছিন্ন ভূগোলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, সার্বিকভাবে তৃতীয় শক্তির জায়গা এখানে প্রায় নেই বললেই চলে। এ রাজ্যের বিধানসভার ভোটে প্রধান দুই দল বা জোট মিলে ৮০-৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে এসেছে অনেক দিন ধরে।

২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বামেদের তাই উচিত ছিল কোমর বেঁধে লড়া, চেষ্টা করা যাতে প্রধান দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে থেকে নিজেদের অস্তিত্ব জিইয়ে রাখা যায়। বাংলার রাজনীতির অঙ্গনে কান পাতলেই শোনা যায় যে, উনিশে বামেরা নাকি উলটে লড়াইটা আলগা করেছিল অনেকটা। উনিশের ভোটে বাংলায় বিজেপির অসম্ভব ভালো ফল যে অনেকটাই তথাকথিত বাম ভোটের দিক পরিবর্তনের ফলশ্রুতি, সেনিয়ে বাংলার রাজনীতিতে দ্বিমত কম। নীচুতলার প্রশ্রয়ে নাকি বিপুল সংখ্যক তথাকথিত বামভোট সঞ্চারিত হয়েছে বিজেপিতে। সেটা হোক আর নাই হোক, বেশ বড় সংখ্যক বাম ভোটার যে উনিশে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, সে বিষয়ে সংশয় নেই। সিএসডিএস-এর স্টাডিতে অবশ্য দেখেছি, একটা বড় সংখ্যক বাম ভোটার নাকি তৃণমূলকেও ভোট দিয়েছেন উনিশে। মোট কথা, ২০১৬-র বিধানসভার ভোটেও প্রায় একপঞ্চমাংশ ভোট পাওয়া বামেরা উনিশে নেমে এল সাত-সাড়ে সাত শতাংশে।

কিন্তু এই একবার পথ-পরিবর্তন করা তথাকথিত বামভোট কি বামেরা ইচ্ছে করলেই আবার ফিরে পেতে পারত? মনে হয় না। ভোটার তো কারও কেনা নয়। আর অন্য অনেক কার্যকারণ থাকলেও ভোট দেওয়া মোটের ওপর একটা অভ্যাস। তাই যে বাম ভোটাররা উনিশে বিজেপি বা তৃণমূলকে ভোট দিলেন, তাঁদের ভোট চাইলেই ফেরতযোগ্য নয়। সে ভোটকে বা তার একটা বড় অংশকে উদ্ধার করতে হলে বামেদের যথেষ্ট পরিশ্রম করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই রাজনৈতিক ঘামঝরানোটুকু বামেরা কি করেছে? নাকি তারা ধরেই নিয়েছে যে, পথ-বদলানো ভোটাররা তাদের নির্দেশে চলবেন?

একুশে নাকি আবার বেশ কিছু বাম ভোটার তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। এসবই রাজনৈতিক মহলের ফিশফাশ। কিন্তু তথাকথিত বাম ভোটাররা যে তৃণমূল হোক বা বিজেপি, অর্থাৎ প্রধান দুই প্রতিপক্ষের কাউকে ভোট দেবেন সেটাই পলিটিক্যাল সায়েন্সের থিওরি এবং এঁরা কেউই কিন্তু সহজে ফিরে আসবেন না বাম অলিন্দে। অন্তত যতদিন না বামেরা ভোটারদের মনে একটা ধারণা তৈরি করতে পারবে যে তারা রাজ্যের প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একটি। সেটা খুব সহজ নয় নিশ্চয়ই।

আবার সাংঘাতিক রকমের কঠিনও কিন্তু নয়। আমার এক প্রাক্তন বামমনস্ক ছাত্রের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় ও হঠাৎ বলল, পৃথিবীর কিছু জায়গায় যেমন দ্বিতীয় পছন্দের ভোট দেওয়ার সিস্টেম আছে, ঠিক তেমন থাকলে দেখতেন আমাদের রাজ্যে বামেরা সবচাইতে বেশি দ্বিতীয় পছন্দের ভোট পেত। আমি কিন্তু কথাটা নিয়ে ভাবতে বসলাম। সত্যি বলতে কী, এ বিষয়ে আমারও সন্দেহ কম যে দ্বিতীয় পছন্দের দল হিসেবে বামেদের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি এ রাজ্যে। এখনও। যদি সত্যিই তাই হয় তার অর্থ এটাই যে, বামেদের শিকড় এখনও এ রাজ্যের মানুষের মনের গভীরে অনেকটাই বিস্তৃত। আর ৩৪ বছরের বামশাসনের লেগাসি হিসেবে তেমনটাই তো স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে নিজেদের হারানো সমর্থনভিত্তি (পড়ুন ভোট) পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বামেদের কাজটা কিন্তু বেশ খানিকটা সহজই হয়ে যায়।

তবু, সেই হারানো গণভিত্তি ফিরে পেতে দরকার বাস্তবের মাটিতে নেমে আসা। প্রয়োজন ভুল স্বীকার করা। কুণ্ঠাহীনভাবে। প্রয়োজন ভুলকে শুধরে নেওয়া। ভুলকে মাথায় রেখে সংগঠন এবং জনসংযোগের ক্ষেত্রে নতুন প্রাণ, নতুন উদ্দীপনা সঞ্চারিত করা। সে কিন্তু বড় সহজ বিষয় নয়। ইতিহাস সাক্ষী।

(লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতার রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক)