নুরপুরে দাম না পেয়ে জমিতেই সবজি নষ্ট হচ্ছে

প্রকাশ মিশ্র, মানিকচক : জমিতে সার সার দিয়ে রাখা দুকেজির প্রমাণ সাইজের বাঁধাকপি। আর একেকটির দাম শুনলে কার্যত চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বড়সড়ো এই বাঁধাকপিগুলি বিকোচ্ছে মোটে ২ টাকায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দামের অভাবে মাঠে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে বিঘা বিঘা জমির বাঁধাকপি। আবার কখনো-সখনো সটান চলে যাচ্ছে গোরু-ছাগলের পেটে। স্বাভাবিকভাবেই কপাল পুড়ছে সবজিচাষিদের।

উন্নতমানের সবজি চাষের ক্ষেত্রে জেলায় এমনিতেই নামডাক রয়েছে মানিকচকের নুরপুরের। কিন্তু এবার সেখানে বাজারদরেও যেন মহামারি। নুরপুরে বর্তমানে পাইকারি দরে বাঁধাকপি বিকোচ্ছে মাত্র এক থেকে দুটাকা কেজি দরে। দুকেজি ওজনের একটি বাঁধাকপির দাম মোটে দুটাকা। অর্থাৎ কেজি প্রতি বাঁধাকপির দাম এক টাকা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সেই দামটা বড়জোর দুটাকা। আর সেই বাঁধাকপিই বাজারে বিক্রি হচ্ছে পাঁচ থেকে দশ টাকায়। অথচ চাষিরা দাম পাচ্ছেন না। কারণ, চাহিদা নেই বললেই চলে। জমিতে পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে বিঘার পর বিঘা বাঁধাকপি। আবার ফেলে রাখাও যাবে না। ওই কপি তুলে ফেলে আবার পরবর্তী চাষের জন্য তৈরি হতে হবে চাষিদের। আর সেই সুযোগ বুঝেই গবাদিপশুকে খাওয়ানোর জন্য সেগুলি সস্তায় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন গৃহস্থরা। তাঁদের যুক্তি ঘাস থেকে বাঁধাকপি দামে সস্তা পড়ছে।

- Advertisement -

ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ে তাই বাঁধাকপি চাষে ক্রমশই অনীহা বাড়ছে সবজিচাষিদের। চাষিরা জানান, এবার পুজোর সময় হঠাৎ বন্যার কবলে বহু বিঘা জমি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আগাম জাতের বাঁধাকপি ও ফুলকপির উৎপাদন মার খায়। কিন্তু জল শুকিয়ে যেতেই আমরা দ্রুত লেট ভ্যারাইটির বা নামলা বাঁধাকপি ও ফুলকপি চাষ শুরু করি। প্রথমদিকে ভালো মুনাফাও হয়। কিন্তু ফুলকপির অবস্থা কিছুটা ভালো থাকলেও গত দিন পনেরো ধরে বাঁধাকপির বাজারে চরম মন্দা যাচ্ছে। চাহিদা একেবারেই নেই। ফড়ে, ব্যবসায়ীরা বাঁধাকপি কিনতে আসছেন একশো-দুইশো টাকা কুইন্টাল দরে। স্বাভাবিকভাবেই লোকসানের ঠেলায় মাঠেই পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে বাঁধাকপি।

এক কৃষক ইমরান খান জানান, আগে মোটামুটি ভালো অবস্থা ছিল। কিন্তু এখন বাঁধাকপির বিক্রি একেবারেই নেই। ফড়েরা বাঁধাকপি নিতে এলেও প্রতি কুইন্টাল ১০০ টাকার বেশি দিতে চান না কেউই। এদিকে আবার বাঁধাকপি কাটার জন্য শ্রমিক পিছু ন্যূনতম ৪০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দিতে হয়। পরে তা শ্রমিক দিয়ে অথবা ভ্যানে করে মাঠের বাইরে নিয়ে যেতে হয়। সেখান থেকে ট্রলিতে বা অন্য কোনও যানবাহনে বাজারে নিয়ে যেতে হয়। ফলে বাঁধাকপি কাটা থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত কেজিপ্রতি এক টাকা খরচ পড়ে যায়। তাহলে বিক্রি করে কী লাভ? আরেক চাষি মণ্টু খান বলেন, গতবারও একইভাবে বাঁধাকপি বিক্রি নিয়ে আমরা সমস্যায় পড়েছিলাম। এখন মাঠের সবজি মাঠে পড়েই নষ্ট হচ্ছে। দাম নেই। তবে মাঠেও তো আবার বেশিদিন রাখা যাবে না। কারণ, এরপর বেগুন বা অন্য কোনও সবজি সেখানে লাগাতে হবে।

আরেক চাষি আইয়ুব মিয়াঁ বলেন, এক বিঘা বাঁধাকপি চাষ করতে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ। শুরুর দিকে লাভ হচ্ছিল। এখন বাঁধাকপির দাম নেই বললেই চলে। সব বাঁধাকপি বিক্রি হলে বিঘা প্রতি বড়জোর চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় হবে। অর্থাৎ বিঘা প্রতি লোকসান প্রায় দশ হাজার টাকা। এর উপরে লিজ নেওয়ার জন্য খরচা তো আছেই। এই অবস্থায় সরকারি সাহায্য পেলে ভীষণ সুবিধা হয়। এর আগেও আমরা আন্দোলন করেছি। কিন্তু কোনও ফল পাইনি। এ প্রসঙ্গে মানিকচকের বিডিও সুরজিৎ পণ্ডিত বলেন, চাষিদের কাছ থেকে এই ধরনের কোনও অভিযোগ আমি পাইনি। পেলে অবশ্যই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনব। অন্যদিকে মালদা জেলা পরিষদের সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল বলেন, বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের। আমি এ ব্যাপারে উদ্যানপালন দপ্তরের সঙ্গে কথা বলব।