প্রকাশ মিশ্র, মানিকচক : বন্যা কেড়েছে সব কিছু। সম্পূর্ণ কর্পদকশূন্য হয়ে ত্রাণশিবিরে এসেও রক্ষে কোথায়? একে চারিদিক জলময়, তার ওপর এখন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টি। বাড়ি কবে ফিরব জানি না, কিন্তু এই মুহূর্তে রীতিমতো প্রাণ হাতে করে বেঁচে রয়েছি। কথা বলতে গিয়ে গলা কেঁপে যাচ্ছিল কোহিনূর বেওয়া, বানু বিবিদের।

বানভাসি গোপালপুর অঞ্চলের নতুন কামালতিপুর গ্রামের বাসিন্দা কোহিনূর বেওয়া। একে বন্যা, তার উপর থেকে বৃষ্টি। দশদিন হল পরিবার নিয়ে বন্যায় তিনি ভিটে ছাড়া। দিন চারেক আগে গোপালপুরের নতুন কামালপুরের প্রাথমিক স্কুলের ত্রাণশিবিরে ঠাঁই হয়েছে বন্যায় সব হারানো কোহিনূর বেওয়ার। তাঁর পরিবার বলতে কেবল দুই সন্তান। বড়ো মেয়ে ৬ বছরের চাঁদনি আর কোলের শিশু চার বছরের আনিশা। কোহিনূর বেওয়া জানান, আনিশা তো একেবারেই দুধের শিশু। সে কেবল বলেই চলেছে, আম্মি বাড়ি চল্… দিনভর কেঁদেই চলেছে মেয়েটা। বন্যায় সব ভেসে যাওয়ায় বাড়ি ছাড়ার পর থেকেই সে জেদ ধরেছে বাড়ি যাবে। সারাদিন ধরে খুঁজে চলেছে নিজের খেলনাপাতি। কিন্তু বাড়িতে তো দুমানুষ সমান জল। সব ভেসে গিয়েছে। ওকে কী করে বোঝাই যে বাড়িঘর সবকিছু কেড়ে নিয়েছে গঙ্গা? চারিদিকে এখন শুধু জল আর জল। তার মধ্যে কোথায় যে বাড়ি ছিল তা এখন ঠাহর করা মুশকিল। শুধু আম গাছ আর বাড়ির চালগুলো দেখা যাচ্ছে।

- Advertisement -

দূরে বাগানের দিকে হাত দেখিয়ে তিনি বললেন, ওই যে বাড়ির চালা শুধু দেখা যাচ্ছে। এখন তো আমাদের বাড়ি বলতে এই ত্রাণশিবির। তবে এই ত্রাণশিবির কেবল নামেই সরকারি। কোনোরকম সুষ্ঠু ব্যবস্থা এখানে নেই। কোনো সরকারি কর্মকর্তা আমাদের দেখতে আসেন না। প্রথম দিন শুধু বিডিও এসেছিলেন। তারপর থেকে মাঝে আর কেউ আসেননি, এমনকি প্রধানও না। পঞ্চায়েত সদস্য মাঝেমধ্যে আসেন। কিন্তু চিঁড়ে-গুড়, ত্রিপল কোনোটাই ভালোভাবে পাচ্ছি না। ত্রাণশিবিরের নীচে ছোট্ট আনিশাকে নিয়ে জলে দাঁড়িয়ে কোহিনূর বেওয়া বলেন, দিন দশেক আগে হঠাৎ করে গঙ্গার জল গ্রামে ঢুকল। কয়েকদিন কষ্ট করে তাও ভিটায় ছিলাম।

তিনি বলেন, কিন্তু একটা সময় পরে সব ভেসে গেল। শেষে এই স্কুলে এসে আশ্রয় নিয়েছি। এখন মোট ২০টি পরিবার এখানে আছে। দু-একদিন আমরা চিঁড়ে পেয়েছি। কিন্তু কোলের শিশুদের মুখে কোনো খাবার তুলে দিতে পারি না। মেয়ে আনিশার আবার জ্বর হয়েছে। ডাক্তার কোথায় পাব? তার সঙ্গে আবার চারিদিকে সাপের উৎপাত। জলের মধ্যে সাপ দেয়াল বেয়ে উঠে যাচ্ছে। বাথরুমেও ফনা উঁচিয়ে থাকছে সাপ। সবসময় প্রাণের ভয়ে থাকি। ২৪ ঘণ্টা বাচ্চাগুলিকে চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে। কোল ছাড়া হলেই জলে নেমে যাবে। ভেসে গেলে তো আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না। দোতলায় ত্রাণশিবির। নীচে অনেকটা জল। সেই জল পেরিয়ে দূরে কোথাও যেতে হয় প্রকৃতির ডাকে। চাঁদনি কিছুটা বড়ো। বছর ছয় বযস। তবু তাকে কিছুটা বোঝানো যায়। বাড়িঘর নেই, সব ভেসে গিয়েছে বুঝতে পারে। কিন্তু আনিশাকে কিছুই বোঝাতে পারছি না।

একই অবস্থা বানু বিবির। তিনি জানান, আমারও কোলের শিশু। বড়োরা চিটাগুড় খেলেও, শিশুদের খাওয়ার সমস্যা। খাবার থাকলে তো তাদের খাওয়াবো! প্রায পাঁচ দিন হয়ে গেল রান্না করা কোনো খাবার দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের বাড়িঘর সব ভেসে গিয়েছে। বাথরুমে জল। টাকাপয়সা তো নেইই। পাছে সন্তান ডুবে না যায়, তাই প্লাস্টিকের বালতিতে কোলের শিশুকে বসিয়ে কোনোরকমে স্নান সেরে নিচ্ছেন রহিমা বিবি। এভাবেই কাটছে নতুন কামালতিপুরের বানভাসিদের এক একটা দিন।