বালি তোলায় ক্রমশ বিপন্ন উত্তরের স্থানীয় মাছ

60

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : চালানি মাছে অনীহার জেরে পাতে স্থানীয় মাছের কদর। বিষয়টি স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীদের পক্ষে স্বস্তিদায়ক হলেও নদী থেকে অবৈজ্ঞানিকভাবে বালি তোলার জেরে এই মাছকে ঘিরেও অশনিসংকেত। কিছুদিন আগে বিহার, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিতে নদীতে মৃতদেহ ভাসতে দেখে আমাদের অনেকেরই আজকাল চালানি মাছে অনীহা। যদিও এই আশঙ্কার কোনও ভিত্তিই নেই। চালানি মাছ হিসাবে আমাদের এখানে যে সমস্ত রুই, কাতলার মতো মাছ বিক্রি হয় সেগুলি দক্ষিণের রাজ্যগুলি থেকে আসে। তবুও একবার গুজব রটলে বেশ কিছুদিন ধরে তো তার রেশ থাকেই। তাই আমাদের অনেকেই আজকাল বাজারে গিয়ে সেভাবে চালানি মাছে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কিন্তু বাঙালির তো আর পাতে মাছ ছাড়া চলে না। তাই আমরা আজকাল বাজারে গিয়ে লোকাল মাছ খুঁজি। অর্থনীতির নিয়মে চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে। সেই অনুযায়ী এই মাছেরও দাম আজকাল বেশ বেড়ে গিয়েছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের মাছবাজারে ঢুঁ মারলেই ছবিটা পরিষ্কার হবে। এই মাছের দাম বাড়ায় স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীদের মুখে হাসিটা যথেষ্টই চওড়া। কিন্তু এই হাসি কতদিন বজায় থাকবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যথেষ্টই সন্দিহান।

কী কারণে এমনটা হচ্ছে? প্রজননের জন্য মাছ নদীর দুপাশে কম জলের ঝোপঝাড়ওয়ালা এলাকা খুব পছন্দ করে। কিন্তু নদীর দুপাশে বাঁধ দেওয়ার জেরে এই এলাকাগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, যথেচ্ছভাবে বালি তোলার জেরে নদীর বুকে বড় বড় গর্ত তৈরি হচ্ছে। এই গর্তগুলি মাছের প্রজননে খুবই সমস্যা তৈরি করছে। উত্তরের নদীর মাছের প্রজনন নিয়ে তথ্যপঞ্জি তৈরির কাজে জড়িত প্রাণীবিদ্যার গবেষক ডঃ সনাতন সরকার বলছেন, সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেড ছাড়াও উত্তরের প্রায় সমস্ত নদীর বুক থেকেই প্রচুর পরিমাণে বালি তোলা হয়।

- Advertisement -

আর্থমুভার দিয়ে একাজ করার জেরে নদীর বুকে বড় বড় গর্ত তৈরি হচ্ছে। জলের স্রোত, উষ্ণতা, গভীরতায় প্রভাব পড়ছে। ভরা বর্ষায় বা বন্যা পরিস্থিতিতে উজানের বালি এসে গর্তগুলিকে ভরিয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু বর্ষার শুরুতে যখন মাছের প্রজনন শুরু হয় তখন এই গর্তগুলিই নদীর বুক ধরে এগোনো মাছের ঝাঁকের কাছে অনেকটা ভুলভুলাইয়া হয়ে দাঁড়ায়। এতে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। ঝাঁক ধরে প্রজননের জন্য যাওয়ার ক্ষেত্রে গোটা বিষয়টি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে, একই সমস্যার জেরে প্রজননের পাশাপাশি মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিও ব্যাহত হচ্ছে। নদীতে মাছের স্বাভাবিক বাসস্থান নিয়ে গবেষণা করা ডঃ শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, একটু লক্ষ করলেই দেখা যায় বাজারে যে স্থানীয় নদীয়ালি মাছ আসে সেগুলির একেকটি এক-এক রকমের আকার। একই ঝাঁকে ঘুরে বেড়ালেও মাছের বৃদ্ধিতে তেমন মিল নেই। এর অন্যতম কারণ মাত্রাছাড়া পরিমাণে বালি তোলায় নদীতলের ভূরূপ আমূল বদলে যাওয়া। এর ফলে একই ঝাঁকে থাকা মাছের প্রজননের সময়ও হেরফের হয়ে যাচ্ছে। নদীকে তার স্বাভাবিক রূপে না ফিরিয়ে দিলে পরবর্তী প্রজন্ম নদীয়ালি মাছ হয়তো চিনবেই না।

মে মাসের শেষদিক থেকে জুলাই মাসের শেষ বা অগাস্টের শুরু পর্যন্ত সময়কে মাছের প্রজননের মূল সময় ধরা হয়। মূলত মরশুমি বৃষ্টিপাতের ওপরই এই সময়কাল নির্ভর করে। এর মধ্যে কিছু প্রজাতির মাছ যেমন বর্ষার মাঝে বা শেষে প্রজনন করে তেমনই কিছু মাছ একেবারে শুরুতে নদীতে বৃষ্টির নতুন জল পড়লেই প্রজননে উৎসাহিত হয়। বর্ষার শুরুতে প্রজননকারী মাছগুলিই মূলত বালি তোলার জেরে সৃষ্ট গর্তগুলির সুবাদে সমস্যায় পড়ছে।

গোটা বিষয়টি নিয়ে মৎস্য দপ্তরও উদ্বিগ্ন। জলপাইগুড়ি জেলার সহকারী মৎস্য আধিকারিক সুমন সাহা বলেন, মাছের স্বাভাবিক আবাসে তৈরি হওয়া যে কোনও রকমের বিঘ্নই তাদের প্রজনন, বংশবৃদ্ধি এবং অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা। যেসব প্রজাতি চাষের মাধ্যমে বেঁচে থাকে বা বংশবিস্তার করে তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার একটা বিকল্প সমাধান পাওয়া গেলেও বোরোলির মতো মাছ এই সমস্যার জেরে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। উল্লেখ্য, বোরোলির মতো মাছ শুধুমাত্র নদীর ওপর নির্ভর করেই বাঁচে। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই মাছকে বাঁচানো সম্ভব নয় বলে সুমনবাবু জানান।