লকডাউনে পোষ্য বেচে উনুন জ্বলে গুরুওয়ারি-সুমিতাদের

399

পুরাতন মালদা : টানা ৪০ দিন লকডাউন চলতে থাকায় সংসারে টান পড়েছে শ্রমজীবী মানুষের। কাজ নেই, নেই আশার আলো। কেউই জানেন না কতদিন চলবে এই পরিস্থিতি। কবে আবার শুরু হবে আয়ের পথ। কিন্তু পেট তো ভরাতেই হবে। সরকার শুধু চাল-আলু দিচ্ছে। কিন্তু একটা সংসার চালাতে গেলে আরও বহু সামগ্রীর প্রয়োজন। প্রয়োজন ওষুধেরও। কিন্তু সেই সব সামগ্রী কিনতে টাকা দরকার। অগত্যা বহু শ্রমিক পরিবার বিপদে পড়ে নিজেদের পোষ্য বিক্রি করছেন। যে কোনও মূল্য পেলেই অনেকেই বাড়ির পোষা ছাগল, পাঁঠা, হাঁস, মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন।

রবিবার সকালে এরকমই ঘটনা নজরে আসে পুরাতন মালদা ব্লকের মঙ্গলবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের নলডুবি গ্রামে। ওই গ্রামের গিয়ে দেখা যায় বেশকিছু দুঃস্থ পরিবার নিজেরাই দড়ি দিযে বেঁধে বাড়ির পোষা ছাগল, খাসি, পাঁঠা নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আবার কারোর হাতে বা ব্যাগে রয়েছে হাঁস, মুরগি। পাইকারেরা এইসব পোষ্যদের কিনে দান দিলে তবে বাড়িতে রান্নার হাঁড়ি চাপবে, এমনই এমনই দাবি ওই গ্রামের দুঃস্থ পরিবারের মহিলাদের।

- Advertisement -

নলডুবি এলাকার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী গুরুওয়ারি মণ্ডল বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গিয়েছেন। বাড়িতে দুটি মেয়ে রয়েছে। তার মধ্যে একজন বিধবা। সব মিলিয়ে দশজনের পরিবার। রোজগার বলতে ইটভাটায শ্রমিকের কাজ। লকডাউনে প্রায় ৪০ দিন হতে চলেছে, কাজ আর নেই। মাঝেমধ্যে গ্রামে কিছু খাদ্যসামগ্রী পেয়েছিলাম। তা দিযে আর কতদিন। নিজেদের পেট ভরাতেই এখন বাড়ির পোষা হাঁস, মুরগি, ছাগল, খাসি, পাঁঠা এগুলো বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। কেউ দিচ্ছে ৭০০ টাকা, আবার কেউ দিচ্ছে ১০০০ টাকা। অসহাযতার সুযোগে পাইকাররাও সস্তায় এগুলো কিনে নিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের আর কোনও উপায় নেই। খিদের জ্বালা না মেটাতে পেরে বাড়ির এই পালিত হাঁস, মুরগি, ছাগল, খাসিগুলি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’

বৃদ্ধ গুরুওযারি মণ্ডল আরও বলেন, ‘আমার মোট নয়টি ছাগল ছিল। সবকটি বিক্রি করে দিয়েছি। কয়েকটি হাঁস, মুরগি ছিল, সেগুলিও পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়ে গিয়েছে। যে টাকা পেয়েছি তা দিযে কোনওরকমে এত বড় সংসার চালাতে হচ্ছে।’

সুনীতা মণ্ডল বলেন, ‘বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা রয়েছে। অর্ধাহারে কোনওরকমে দিন কাটছে। ইটভাটায কাজ করে আমাদের সংসার চলছিল। কিন্তু এখন রোজগার নেই কারণ ইটভাটা বন্ধ। অনেক শখ করে কয়েকটি ছাগল, হাঁস, মুরগি পুষেছিলাম। এখন সব বিক্রি করে দিচ্ছি। রবিবার বাড়ির শেষ সম্বল দুটি ছাগল বিক্রি করে দিলাম। হাতে এল দুই হাজার টাকা। এদিয়ে এই কদিন চলবে। তারপরে জানি না কী হবে।’

স্থানীয এক পাইকার সুবোধ মণ্ডল বলেন, ‘আগে যেমন বাড়ি বাড়ি গিযে হাঁস, মুরগি, পাঁঠা, ছাগলের খোঁজ করতে হত, এখন সেই কাজ কমে গিয়েছে। অনেকেই আমাদের মতন পাইকারদের খোঁজ করছেন বাড়ির পালিত হাঁস, মুরগি, ছাগল বিক্রি করার জন্য। দরদাম করছি, সঠিক মূল্য দিয়ে আমরা সেগুলি কিনে নিচ্ছি।’

লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যে গ্রামবাসীদের এতটা অসহায় অবস্থায় পড়তে হচ্ছে কেন?
কেনই বা সংশ্লিষ্ট পঞ্চাযে বা প্রশাসন এরকম দিনমজুর পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াচ্ছে না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিস্তর অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। মঙ্গলবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য রিপন বর্মন জানিয়েছেন, ‘পঞ্চায়েতের পক্ষে যতটা সম্ভব খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সাহায্য করা হচ্ছে। এছাড়াও রাজ্য সরকার রেশনে বিনামূল্যে চাল, আটা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। তারপরেও বাড়ির হাঁস, মুরগি, ছাগল বিক্রি করার কোনও খবর আমাদের কাছে নেই। কাজেই এব্যাপারে বিশদ কিছু বলতে পারব না।’

পুরাতন মালদার পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মৃণালিনী মণ্ডল মাইতি বলেন, ‘এই ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানা নেই। কারণ, তাতে যেভাবে রাজ্য সরকার দুঃস্থ মানুষের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িযে দিয়েছে, এতটা সংকটের মুখে পড়ার কথা নয় কোনও পরিবারের। তবুও পুরো বিষযটি খোঁজ নিযে দেখছি।’

তথ্য ও ছবি- রেজাউল হক