খুদেদের পড়ার অভ্যাস ধরে রাখছেন সরোজিৎ

277

জলপাইগুড়ি : কারও বাবা দিনমজুর, কারও মা চা শ্রমিক। স্মার্টফোন তো দূর, ফোনই নেই অনেকের বাড়িতে। ফলে করোনা সংক্রমণ ও লকডাউনের মধ্যে অনলাইন ক্লাস ওদের কাছে একেবারেই অজানা শব্দ। তবে ওই খুদে পড়ুযারা যাতে শিক্ষার মূলস্রোত থেকে ছিটকে না যায়, সেজন্য উদ্যোগ রয়েছে। জলপাইগুড়ি শহর সংলগ্ন পাহাড়পুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পাতকাটা আরআর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরোজিত্ চাকি তিনমাস ধরে অভিনবভাবে তাদের পড়াচ্ছেন।

লকডাউনের জেরে তিনমাসেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ। তবে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সেগুলির শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের অনলাইনে ক্লাস করানো সম্ভব হবে না, এটা জানেন সরোজিৎবাবু। তাই পড়ুয়ারা যাতে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনার অভ্যাস হারিয়ে না ফেলে সেজন্য বিকল্প পন্থা নিয়েছেন তিনি। প্রাক-প্রাথমিকের পড়ুযাদের বাদ দিযে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ১৪৮ জন পড়ুযাকে বাড়ির অবস্থান হিসেবে সাতটি জোনে ভাগ করেন তিনি। প্রতিটি জোনে ১৫-২০ জন পড়ুযাকে রাখা হয়। এরপর সপ্তাহে এক-এক দিন এক-এক জোনে গিযে ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। আবহাওয়া ভালো থাকলে কারও বাড়ির উঠোন বা গাছতলায় ক্লাস হয়। নয়তো কারও বাড়ির বারান্দা ভরসা। গত তিনমাসে একদিনও এই বিকল্প ক্লাস বন্ধ থাকেনি।

- Advertisement -

ক্লাসে পড়ুযাদের আকর্ষণ করতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপহারের ব্যবস্থাও করেছেন সরোজিৎবাবু। সপ্তাহে একদিন কখনও বেলুন, কখনও চকোলেট উপহার পায় পড়ুয়ারা। এমনকি করোনা সংক্রমণের কথা মাথায় রেখে পড়ুযাদের সাবান উপহার দিয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যাবতীয বিধি মেনেই ক্লাস চলছে। ক্লাসে বসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায রাখছে পড়ুযারা। প্রত্যেক পড়ুযাকে সরোজিৎবাবু নিজের খরচে মাস্ক কিনে দিয়েছেন। ক্লাস শুরুর আগে বাধ্যতামূলকভাবে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয়। সংক্রমণ ঠেকাতে কী করণীয়, প্রতিদিন একবার তা নিয়ে আলোচনা হয়। তারপর পঠনপাঠন শুরু হয়। জুনেই প্রথম পর্যায়ে সিলেবাস শেষ হয়েছে, এরমধ্যে একপ্রস্থ মূল্যায়নও হয়ে গিয়েছে। শুধু ক্লাস নেওয়াই নয়, দুঃস্থ ১২ পড়ুয়ার পরিবারকে সাহায্য করছেন তিনি।

ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানের শ্রমিক আলফ্রেক টিগ্গা বলেন, ‘সরোজিৎবাবুর জন্যই আমাদের সন্তানরা এখনও নিয়মিত পড়াশোনা করছে। তিনি বাচ্চাদের সমস্ত দিকে খেয়াল রাখেন।’ সরোজিৎবাবু বলেন, ‘আমার ২৬ বছরের চাকরিতে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অনেকেই স্কুলে আসার অভ্যাস হারিয়ে ফেলতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকে আমি স্বাস্থ্যবিধি মেনে ওদের ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ওদের পড়াতে পেরে আমারও ভালো লাগছে।’

ছবি- পড়ুয়াদের ক্লাস নিচ্ছেন হেডস্যার।

তথ্য ও ছবি- সৌরভ দেব