দীপংকর মিত্র, রায়গঞ্জ : রায়গঞ্জ ব্লকের রূপাহার, পিপলান, মাড়াইকুড়া, গোয়ালপাড়া, মহাদেবপুর, ছত্রপুর সহ একাধিক গ্রামের দরিদ্র মানুষ ঋণের জালে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে। গ্রামের অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্র ঋণদাণকারী সংস্থাগুলির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মোবাইল ফোন, টিভি, ডিশ, মোটর সাইকেল সহ বিভিন্ন সামগ্রী কিনছে। সারাদিন দিনমজুরির কাজ করে যে টাকা আয় হয়, তার অর্ধেকের বেশি টাকা চলে যায় তাদের ঋণের টাকার কিস্তি পরিশোধ করতে। কেউ ঋণ নেয় পাঁচ হাজার, আবার কেউ ১০ হাজার। এই টাকা শোধ করলেই আবার মেলে ২০ হাজার এবং ৩০ হাজার।

এজন্য প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে জমা দিতে হয় কিস্তির টাকা। কোনো সপ্তাহে কিস্তির টাকা জমা না পড়লেই ঋণদানকারী সংস্থাগুলি চেপে বসে ঋণ গ্রহিতাদের ওপর। বাধ্য হয়ে অনেক সময় ঋণের কিস্তির টাকা জোগাড় করতে গিয়ে মহাজনের থেকে তাদের আবার ঋণ করতে হয়। কখনও আবার ঘরের জিনিস বিক্রি করে কিস্তি মেটাতে হয়। প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ নিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলিতে প্রায়ই অশান্তি বাধছে। আবার কিছু ক্ষুদ্র ঋণদাণকারী সংস্থা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের ঋণ না দিয়ে নিজেরাই সরাসরি গ্রামের মানুষকে প্লাস্টিকের চেয়ার থেকে শুরু করে আলমারি, শোকেস, খাট, টিভি কিস্তির বিনিময়ে তুলে দিচ্ছে। এজন্য প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কিস্তি শোধ করার জন্য তুলে রাখতে হয় পরিবারগুলিকে।

গ্রামের একাংশ মানুষের অভিযোগ, অশিক্ষিত দিনমজুর মানুষগুলিকে এভাবে দিনের পর দিন ঋণের জালে আবদ্ধ করে রাখছে ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সংস্থাগুলি। গ্রামের মানুষ সহজেই ঋণ পেয়ে যাচ্ছে। কিন্ত প্রতি সপ্তাহে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। গ্রামের মহাজনের কাছ থেকে বাধ্য হয়ে আবার ঋণ করতে হচ্ছে। অভিযোগ, ঋণদাণকারী সংস্থাগুলি নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে কোনো কিছু যাচাই না করেই গোষ্ঠীর মহিলাদের হাতে ঋণের টাকা তুলে দেয়। সাধারণত ছোটোখাটো ব্যবসা এবং স্বনির্ভর হওযার উদ্দেশ্যে মহিলাদের গৃহপালিত গোরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি পালনের জন্য ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সংস্থাগুলি ঋণ দিয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঋণদাণকারী সংস্থাগুলি কোনো কিছু যাচাই না করেই গ্রামের দিন আনা দিন খাওযা মানুষগুলিকে মোটা অংকের টাকা ঋণ দেয়। প্রথমে অল্প টাকা ঋণ দিয়ে তাদের সংস্থার সঙ্গে জড়িয়ে নেয়।

ওই টাকা শোধ করতে না করতেই আবার ঋণ দেওযা হয়। এককথায় ঋণের জালে আবদ্ধ করে ফেলা হয় গ্রামবাসীদের। যে উদ্দেশ্যে এই ঋণ দেওযা হয়, সেই উদ্দেশ্য কাজে না লাগিয়ে আমোদ-প্রমোদের জন্য ঋণের টাকা ব্যবহার করে গরিব মানুষ। লটারি এবং জুয়ার বোর্ডেও অনেকে সেই টাকা লাগায়। কেউ আবার মোবাইল, টিভি কেনে। ফলে কিস্তির টাকা জোগাড় করতে হিমসিম খেতে হয় দরিদ্র মানুষগুলিকে। দেখা যায়, ঋণের টাকা হাতে পেয়ে অনেকে কয়েকদিন কাজে যাওযা বন্ধ করে দেয়। আনন্দে মত্ত থাকে। ঋণের কিস্তির দিন আসতেই বাড়িতে শুরু হয় অশান্তি। তখন বাধ্য হয়ে মহাজনদের কাছ থেকে মোটা অংকে সুদে টাকা ধার করে। আবার অনেক সময় ঘরের মূল্যবান জিনিস বিক্রি করতে বাধ্য হয় তারা।

উত্তর রূপাহারের পটলা বর্মন, শাতানু বর্মন, দ্বীপনগরের বাসিন্দা বাসুদেব সরকার, দেবীনগরের নিরঞ্জন সরকার সহ অনেকেই ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সংস্থা থেকে বিভিন্ন ঋণ নিয়েছেন। তাঁরা যে ভুক্তভোগী তা তাঁদের কথাবার্তায় বোঝা গিয়েছে। দেবীনগর কসবার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নিরঞ্জন সরকার জানান, একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে এগরোল, চাউমিনের ব্যবসা শুরু করেছি বেশ কিছুদিন আগে। প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হিমসিম খাচ্ছি। কারণ, ব্যবসা নেই। এলাকার অধিকাংশ মানুষ ঋণের ফাঁদে জর্জরিত। কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন যে টাকা আয় করছে তার অর্ধেকের বেশি টাকা ঋণ পরিশোধ বাবদ রেখে দিতে হচ্ছে। ফলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়েছি বিপদে।

উত্তর রূপাহারের পটলা বর্মন শহরে দিনমজুরের কাজ করেন। তাঁর স্ত্রীও গ্রামেই মাঠে কাজ করেন। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা রয়েছেন। পটলা জানান, গ্রামে বিভিন্ন সংস্থা এসে মহিলাদের ঋণ দেয়। হাঁস-মুরগি পালনের জন্য কয়েকবার ঋণ নিয়েছি। কিন্ত প্রতি সপ্তাহে কিস্তির টাকা দিতে গিয়ে হিমসিম খেতে হয়। এখন তো কয়েকটি ঋণদাণকারী সংস্থা হাতে টাকা না দিয়ে নিজেরাই টিভি, মোটর সাইকেল, মোবাইল ফোন দিচ্ছে। ঋণ পেতে ঝামেলা না থাকলেও কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে আবার মহাজনের থেকে ঋণ করতে হচ্ছে। একই দাবি প্রদীপ সরকারেরও। তিনি বলেন, ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হচ্ছে। কিস্তির টাকা দিতে না পারলে ঋণদানকারী সংস্থা বাড়ির জিনিস তুলে নিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মানুষের তেমন আয় নেই। অধিকাংশ মানুষ দিনমজুরি করে।

পিপলান গ্রামের বাসিন্দা জয়ন্তী বর্মন শহরের একটি স্কুলের ক্যান্টিনে কাজ করেন। তিনি জানান, মহিলা গোষ্ঠীগুলিকে এরা ঋণ দেয়। কিন্ত স্বামীরা সেই টাকা নিয়ে নেয়। কোনো সপ্তাহে কিস্তির টাকা দিতে না পারলে গোষ্ঠীর অন্য মহিলাদের দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে মহাজনের থেকে টাকা ধার করতে হয়। তিনি বলেন, টাকা শোধ করার পর গোষ্ঠীর কোনো সদস্য আর ঋণ নিতে না চাইলেও তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। লোভ দেখানো হয়। বাধ্য হয়ে আবার ঋণ নিতে হয়। রায়গঞ্জ ব্লকে পাঁচ থেকে ছটি ক্ষুদ্র ঋণদাণকারী সংস্থা গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিম্ন আয়ভুক্ত পরিবারগুলিকে নিয়ে ঋণের কারবার করে। নিজেদের চাহিদা এবং অভাব মেটাতে মহিলারা বাধ্য হয় ঋণের ফাঁদে পা দিতে। একটি ক্ষুদ্র ঋণদাণকারী সংস্থার সহকারী ম্যানেজার সমীর মণ্ডল জানান, আমরা নিয়ম মেনেই গ্রামের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মহিলাদের ঋণ দিয়ে থাকি। তারা সব কিছু জেনেশুনে ঋণ নেয়। কোনো প্রতারণার সঙ্গে আমরা যুক্ত নই।