চা বাগানে ভোট বেশি পড়ায় জোর জল্পনা

88

শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : বন্ডেড লেবার-এর তকমা ঘোচাতে, জমির অধিকার আদায়ে এবার চা বাগানে ঢালাও ভোট দিয়েছেন শ্রমিকরা। ন্যূনতম মজুরি, বাগানের শূন্যপদে নিযোগ, এক্সট্রা লিফ পাইসের পরিমাণ বাড়ানো (ডাবলি) বা প্রো-রেটা প্রথার অবলুপ্তির দাবিগুলি তো ছিলই।

জলপাইগুড়ি জেলার সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র মিলিয়ে ৭০টিরও বেশি চা বাগানের বুথ থেকে যে খবর মিলেছে তাতে কোথাও ভোট পড়েছে ৮০ শতাংশ, আবার কোথাও তা ৯০ শতাংশও ছুঁয়ে গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলে এখন জোর আলোচনা শুরু হয়েছে শ্রমিকদের এত বিপুল সংখ্যক ভোট তবে কাদের দিকে গেল? সেফোলজিস্ট বা ভোট পরিসংখ্যানবিদদের মধ্যে একটি চালু কথা রয়েছে ভোটের সংখ্যা বাড়লে তা সাধারণত প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে ইঙ্গিত করে। যদিও সব সময় ওই তত্ত্ব যে ঠিক হয়েছে তা কিন্তু নয়। এবারের নির্বাচনে চা বলয়ে যুযুধান বিজেপি, তৃণমূল কিংবা সংযুক্ত মোর্চা তিন শিবিরেরই দাবি শ্রমিকদের আশীর্বাদ তারাই পেয়েছে।

- Advertisement -

চা বাগানে জমির পাট্টার দাবি দীর্ঘদিনের জ্বলন্ত ইস্যু। শ্রমিকরা বাগানের যেখানে বংশপরম্পরায় একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন সেই জমির ওপর তাঁদের কোনও অধিকার নেই। মালিকের হাতে লিজে থাকা ওই জমিতে বসবাসের নিঃশর্ত দলিল বা পাট্টা তাঁরা কেন পাবেন না এই প্রশ্নে ডুয়ার্সের শ্রমিকদের বারবার পথেও নামতে দেখা গিয়েছে। এবারের ভোটে সেই জমির পাট্টাই বড় ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে বাগানগুলিতে।

বন্ধ ধরণীপুর চা বাগানের কমলি যাদব নামে এক শ্রমিক বলেন, জমির পাট্টা নেই। এজন্য সরকারি ঘর পেলে তা তৈরির জন্য মালিকের নো অবজেকশন সার্টিফিকেট লাগে। এতদিন ধরে এখানে বসবাস করেও আমাদের পরিস্থিতি যেন নিজভূমে পরবাসীর মতো। জমির অধিকারের দাবিতে ভোট দিয়েছি। একই সুরে গ্রাসমোড় চা বাগানের মমতা ওরাওঁ নামে এক শ্রমিক বলেন, পাট্টা পেলে ব্যাংক থেকে ঋণও মিলতে পারে। যেখানে থাকি সেটা নামেই আমাদের। বাস্তবে তা বাগানের। জমির অধিকার আদায়ের জন্যই ভোট দিয়েছি।

ন্যূনতম মজুরির দাবির কথাও চা বাগানে উঠে এসেছে এবার বারবার। তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার অবশ্য গত ১০ বছরে চা শ্রমিকদের মজুরি ৬৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকায় নিয়ে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১৭৬ টাকার পুরোনো মজুরির হার বাড়িয়ে ২০২ টাকা করা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার চা সুন্দরী নামে শ্রমিকদের জন্য একটি আবাসন প্রকল্পের কাজেও হাত দেয়। ওই দুই পদক্ষেপকে হাতিয়ার করে তৃণমূল চা বাগানে জোরদার ভোটের প্রচারও চালায়।

ঘাসফুল শিবিরের নেতাদের দাবি এর ডিভিডেন্ড তাঁরা ভোটবাক্সে পেয়েছেন। চা বাগান তৃণমূল কংগ্রেস মজদুর ইউনিয়নের সহ সভাপতি ধনবাহাদুর ছেত্রী বলেন, বাগানে যে সাইলেন্ট ভোট হয়েছে এটা সত্য। তবে শ্রমিকদের আশীর্বাদ আমরাই পেতে চলেছি। একথা মানতে নারাজ বিজেপি সাংসদ ও ভারতীয় টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জন বারলা। তিনি বলেন, লোকসভা ভোটের চেয়ে চা বাগানে আমরা বেশি ভোট পেতে চলেছি। সরকারে এলে বিজেপি যে শ্রমিকদের জমির পাট্টা দেবে তা বারবার বলা হয়েছে। আর ন্যূনতম মজুরি সাড়ে তিনশো টাকা করাটা আমাদের অঙ্গীকার।

 চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য জিয়াউল আলম বলেন, চা বাগানের শ্রমিকরা রাজ্য ও কেন্দ্র দুই শাসকের বিরুদ্ধেই তাঁদের জনাদেশ দিয়েছেন। বনবস্তিবাসীদের জমির পাট্টা দেওয়ার জন্য বাম সমর্থিত প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলে ফরেস্ট অ্যাক্টের মতো কঠিন একটি আইনকে সংশোধন করার সাফল্যের কাহিনী কারও অজানা নয়। চা বাগানের ক্ষেত্রেও সংযুক্ত মোর্চা জমির পাট্টা দেওয়ার কথা দৃঢ়ভাবে বলেছে।

সাধারণ শ্রমিকরা বলছেন, জমির পাট্টা, ন্যূনতম মজুরির পাশাপাশি বাগানে ডাবলির টাকা বাড়ানো এখন সময়ে চাহিদা। একইভাবে নির্ধারিত কাজের টাস্ক পূরণ করতে না পারলে আনুপাতিক হারে মজুরি কেটে নেওয়ার প্রো-রেটা নামে যে প্রথা রয়েছে সেটারও অবলুপ্তির প্রয়োজন।