দুই পড়ুয়াকে নিয়ে অথই জলে বাবা, দুমুঠো ভাতের জন্য প্রার্থনা

321

জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : জলপাইগুড়ি শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরলে দেখা যায় রাস্তার ধারে টেবিলে লটারি টিকিট সাজিয়ে বহু বিক্রেতা বসে আছেন। আবার কেউ হাতে টিকিট নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছেন। এই বিক্রেতাদের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা মিলিয়ে তিনবার খেলা হয়। ফলাফল আসার সঙ্গে সঙ্গে লটারির কাউন্টারগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় উপচে পড়ে। কেউ লটারি পান, আবার কেউ পান না। তাতে বিপিনবাবুর আয়ের বড় রকমের হেরফের হয় না। ছাপোষা মানুষ দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার চলে যায়। এর মধ্যেই স্বপ্নও দেখেন। ওরা পড়াশোনা করে বড় হবে। মানুষের মতো মানুষ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে পাহাড়িপাড়ার সবার চোখের সামনে। তাঁর ছেলে জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র। মেয়ে আনন্দচন্দ্র কমার্স কলেজের ছাত্রী। এই লকডাউনে আর্থিক অনটনে তাঁর স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তবু হাল ছাড়েননি লটারির টিকিট বিক্রেতা বিপিন শা। ডিবিসি রোডে রাস্তার ধারে মুদিখানার সামগ্রী বিক্রি করছেন। সারাদিনে ২০০ টাকার জিনিস বিক্রি হচ্ছে। রোজগার বলতে এখন এটুকুই। সংসার কীভাবে চলবে তিনি ভেবেই পাচ্ছেন না।

বিপিনবাবু বললেন, এই শহরে দুই দশকের বেশি সময় ধরে লটারির টিকিট বিক্রি করছি। এদিয়ে ছেলেমেয়ে পড়াশোনা এবং সংসার কোনও রকমে চলছিল। লকডাউন ঘোষণার পর লটারির ক্রেতারা আর বাজারে আসছেন না। নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ বাজারমুখো হচ্ছেন না। তিনি বলেন, পরিস্থিতির চাপে রাস্তায় মুদির দোকানের সামগ্রী নিয়ে বসেছি, সঙ্গে কাঁচা সবজিও থাকছে। ফুটপাথে দোকানির সংখ্যা বেশি হওয়ায় আমার দোকানে ক্রেতার সংখ্যা কম। তবু লকডাউন যতদিন চলবে, ততদিন মুদির সামগ্রীই বিক্রি করব। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুরোনো ব্যবসায় আবার ফিরব। কিন্তু পুরোনো ব্যবসায় ফিরতে চাইলেই কি অত সহজে ফেরা যায়?  বিপিনবাবু বলেন,আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পুঁজিতে যেমন টান পড়েছে,তেমনি সঞ্চিত অর্থেও টান পড়েছে। বড় বিপাকে পড়েছি। মুদির দোকান থেকে প্রতিদিন যা রোজগার হচ্ছে তা দিয়ে সংসারের খরচ উঠছে না। তার ওপর ছেলেমেয়ে পড়াশোনার চাপ তো রয়েছেই। শুধু লকডাউন বলে নয়, লটারির টিকিট বিক্রেতাদের আয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ভাটার চান ধরেছিল। প্রাইজ না পাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল। টিকিটের চাহিদাও ছিল পড়তির দিকে। ফলে লটারির টিকিট বিক্রির পেশা ছেড়ে টোটো চালানো, চপঘুগনি ও ফাস্ট ফুড বিক্রির পেশা ধরছিলেন। বিপিনবাবু বলেন, এখন তো রীতিমতো অস্তিত্বের সংকট। আমার হাতে বিক্রি করা টিকিটে অনেকেই লক্ষপতি হয়েছেন। আমি বৈভবের মধ্যে থাকতে চাই না। একটাই প্রার্থনা কোনওভাবে ছেলেমেয়ে মুখে দুবেলা দুমুঠো ভাত যেন তুলে দিতে পারি।

- Advertisement -