ময়নাগুড়ি : ছেলের সামান্য রোজগার আর নিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকায় সংসার চলে। তাই ৮৫ বছরের জ্যোৎস্না সরকারকে এই বয়সেও ময়নাগুড়ি বাজারে ঘুরে ঘুরে লটারির টিকিট বিক্রি করতে। গত ৩৫ বছর ধরে এভাবেই লটারির টিকিট বিক্রি করেন তিনি। ময়নাগুড়ি শহিদগড় স্কুল পাড়ার বাসিন্দা। সকালে ঘুম ভাঙার পর বাড়ির কাজ সেরে স্নান করে জলখাবার খান। তারপর  ফোলিও হাতে সোজা চলে আসেন ময়নাগুড়ি নতুন বাজারে।

বাজারের সকলেই মাসি বলে ডাকে তাঁকে। প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ লটারির টিকিট বিক্রি করেন। সেটা ময়নাগুড়ি নতুন বাজারে সাপ্তাহিক দুদিন মঙ্গল ও শুক্রবার বেড়ে দাড়ায় ৬০০ থেকে ৭০০ টিকিটে। অশীতিপর বৃদ্ধার এখনও  পরিশ্রমে বিশ্বাসী। আর সেটাই তাঁর সবথেকে বড়ো পুঁজি। স্বামী ধীরেন সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ৩৫ বছর আগে মারা যান তিনি। তখন ছেলে সুজিতের বয়স তখন মাত্র ৭ বছর আর মেয়ে শ্যামলীর বিয়ের বয়স হয়েছে।  মাথায় আকাশ ভেঙ পড়ে জ্যোৎস্নাদেবীর। ঘরে টাকা পয়সা নেই, পুরো সংসারের দায় দায়িত্ব তাঁর কাধেঁ চাপে।

শুরু হয় লড়াই। মহাজনদের কাছ থেকে ঋন করে লটারির টিকিট নিয়ে বাজারে বিক্রি করতেন। দিনের শেষে মহাজনদের পাওনা মিটিয়ে নিজের লভ্যাশ নিয়ে ঘরে ফিরতেন। বছরখানেক পর মেয়ের বিয়ে দিলেন। ছেলে সুজিতকে বড়ো করে তোলা এবং সংসার ঠেলে নেওয়া দুইই চলল একার হাতে। বড়ো মেয়ে দুলালীকে স্বামী থাকাকালীন বিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। ছেলের বিয়ে দিয়েছেন তিনি একাই।

জ্যোৎস্নাদেবী বলেন, ‘এভাবেই এতগুলো বছর কেটে গিয়েছে। ছেলে সুজিত বাজারে একটি ওষুধের দোকানে কাজ করছে। সামান্য কিছু রোজগার করে। সুজিতের দুই মেয়ে মৌসোনা আর শীলা। মৌসোনা কলেজে পড়ছে। শীলা এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। সুজিত, পুত্রবধূ ইলা আর তাদের দুই মেয়েকে নিয়ে আমার সংসার। তিনি বলেন, ‘সব কাজ মোটামুটিভাবে সেরেছি। তবে ভালো বাড়িঘর এখনও করতে পারিনি। সরকারিভাবে একটি ঘরের টাকা পেয়েছি। সেইসঙ্গে আমার কিছু টাকা মিলিয়ে দুটো ঘর করেছি। একটিতে আমি থাকি এবং অন্যটিতে ছেলে সুজিত তাঁর মেয়ে ও  বউকে নিয়ে থাকে। এখন আর বাজারে না এলে ভালো লাগে না। একেবারেই সময় কাটে না।’

ময়নাগুড়ি বাজারের ব্যবসায়ী নিতাই রায় বলেন, ‘এত বছর ধরে জ্যোৎস্নামাসি ময়নাগুড়ি নতুন বাজারে লটারির টিকিট বিক্রি করেন। সকলেই টিকিট কাটেন তাঁর কাছ থেকে। সকাল হলেই চলে আসেন বাজারে। শারীরিক কোনো সমস্যা নেই এখনও। কোনো ওসুধ  খেতে দেখিনি।’

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর রাত ঘরে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে যায়। পরোয়া করেন না জ্যোৎস্নাদেবী। ইচ্ছা থাকলে যে উপায় হয় সেটাই দেখিয়ে দিয়েছেন এই বৃদ্ধা।

তথ্য ও ছবি- বাণীব্রত চক্রবর্তী