লক্ষ্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বৃদ্ধি, অ্যাম্বুলেন্স চালান এমএ পাস সুধারানি

359

মনজুর আলম, চোপড়া : এমএ পাসের পর সবাই ভালো একটা চাকরি জুটিয়ে নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। চোপড়া ব্লকের মাঝিয়ালি গ্রাম পঞ্চায়েতের সীমান্তের শ্যামগছ গ্রামের মেয়ে সুধারানি সিংহও সেই স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে নিজের নয়, অন্যের জন্য। এই স্বপ্নের সুবাদেই দুহাতে বশ মেনেছে স্টিয়ারিং। রাতবিরেতে অজ পাড়াগাঁয়ে কোনো অন্তঃসত্ত্বাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে? সুধারানির কাছে কেবল খবরটুকু পেঁছালেই হল। অ্যাম্বুলেন্স হাঁকিয়ে তড়িঘড়ি সেখানে পেঁছে যাবেন তিনি। একবার বা দুবার নয়, তিনি একাজ করে চলেছেন বারবার। তাঁর এহেন অবদানে এলাকায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার অনেকটাই বেড়েছে বলে মেনে নিচ্ছে খোদ স্বাস্থ্য দপ্তরও। এলাকায় অনেকের কাছেই অ্যাম্বুলেন্স দিদি হিসাবে পরিচিত সুধারানির অবদানকে কুর্নিশ ঠুকছেন দলুয়া ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিএমওএইচ ডাঃ জাহাঙ্গির আলমও। তাঁর কথায়, ওই যুবতির ব্যক্তিগত উদ্যোগে এলাকায় গার্হস্থ্য প্রসবের হার কমে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার অনেকটাই বেড়েছে।

সরলসিধে মনটা বরাবরই নাছোড়বান্দা। তাই পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েশনের পর বাকিরা যখন চাকরির পরীক্ষায় খুব ব্যস্ত তখন নিছক অপেক্ষার ভেলায় নিজেকে ভাসাতে চাননি পাঁচ ভাইবোনের সবচেয়ে ছোটো সুধারানি। গাড়ি চালানোকে পেশা করবেন ধরে নিয়ে দুবছর প্রশিক্ষণ নেন। এরপরই মাঝিয়ালি সংঘের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স চালানোর কাজ জুটে যাওয়া। আর তারপর থেকেই ম্যাজিকের মতো জীবনের ভোলবদল। প্রসব বেদনা ওঠা কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে বলে মোবাইলে খবর পেলেই হল। সুধারানি তাঁর বাহন নিয়ে হাজির সেখানে। শুধুই কি কাছেপিঠের হাসপাতাল? কতবার রোগী নিয়ে রাতবিরেতে ৪০ কিলোমিটার দূরের ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতাল বা ৫৫ কিলোমিটার দূরের উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যেতে হয়েছে। মেয়ে হয়ে এভাবে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এতটা দূরে যাতায়াতে ভয় লাগে না? প্রশ্ন শুনে হাসেন সুধারানি। বলেন, প্রথমদিকে যে ভয়ডর একটু লাগত না তা নয়। কিন্তু আমি নিজে তো একজন মেয়ে তাই আরেকজন মেয়ে কষ্ট কী তা ভালোমতোই বুঝি। সেদিকে তাকিয়ে সেই ভয়ডর যে কবে গায়েব হল টেরই পেলাম না। বাবা সুবল সিংহ ও পরিবারের অন্যদের সমর্থন অ্যাম্বুলেন্স দিদির মনের জোরটা আরও বাড়িয়েছে।

মাঝিয়ালি সংঘের দলনেত্রী তথা চোপড়া পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ আসমানতারা বেগম বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে হাত দিয়ে সীমান্ত এলাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে মাঝিয়ালি সংঘকে একটি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়। এলাকায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে। সংঘের সদস্য সুধারানি দুবছর ধরে সেটি চালাচ্ছেন। ওঁর অ্যাম্বুলেন্স পরিসেবায় এলাকায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার অনেকটাই বেড়েছে। সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সুধারানি অস্ফুটে বলেন, প্রতিবার অন্তঃসত্ত্বাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে সংঘ থেকে কিছু টাকা পাই। এটাই আমার একমাত্র উপার্জন। কিন্তু এভাবে নয়,  মাসমাইনের একটা ব্যবস্থা হলে কাজটা আরও ভালোভাবে করতে পারি।