মাধবী-নির্মলকুমার ৮০তেও আসিও

196

নিউজ ব্যুরো : ১০ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। ৭৯ বছরে পা রাখবেন চারুলতা। মাধবী মুখোপাধ্যায়। সেদিন হয়তো বড় মেয়ে মিমির আবদারে স্বামী নির্মলকুমারের বাড়িতে গিয়ে কেক কেটে, তাঁর হাত থেকে উপহার নিয়ে বেশ কিছুটা সময় কাটাবেন স্বামী-কন্যা-জামাই-নাতনির সঙ্গে আনন্দ করে। ঠিক যেমনটা স্বামী-বাড়ি এসে কাটিয়েছেন, কিছুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর। নির্মলকুমারের ৯২ বছরের জন্মদিন উপলক্ষ্যে। একসঙ্গে সপরিবারে সময় কাটিয়েছেন এর আগেও জন্মদিনে, পুজোর উৎসবে। কিন্তু তারপর চারু ফিরে গিয়েছেন নিজের একার সংসারে। এদিনও জন্মদিনের উৎসব শেষে, তিনি ফিরে যাবেন নিজের ফ্ল্যাটে। নিভৃত নিরালায়। স্বেচ্ছার স্বাধীন সংসারে। স্বামী-সংসার থেকেও, একসঙ্গে না-থাকার স্বাধীন জীবনে।

লেক গার্ডেন্স এলাকায় অভিনেতা-দম্পতির দুজনের বাসার ব্যবধান, হাঁটাপথে বড়জোর মিনিট সাত-আটেকের পথ। বিবাহিত জীবন দীর্ঘ ৫২ বছরের। কিন্তু সেই জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে নির্মলকুমার তাঁর বড় মেয়ে মিমি-জামাই-নাতনি জয়ীকে নিয়ে থাকেন লেক গার্ডেন্সের নিজের দোতলা বাড়িতে। মাধবী সংসার থেকে সরে এসে থাকেন, সামান্য দূরের গোবিন্দপুর রোডের নিজের একার ফ্ল্যাটে। মাস কয়েক হল দেখভালের জন্য রেখেছেন রাত-দিনের এক আয়া।

- Advertisement -

অথচ কী এক রহস্যময়তার টানে আলাদা থেকেও সুখে-দুঃখে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মেয়ে-নাতনির টানে নির্মল-মাধবী মিলিত হন দুজনায়। কাটান বেশ কিছুটা একত্রে সময়। এমনিতে ৯২ বছরে পৌঁছে, নির্মল আজও তরুণ। ভোরে উঠে খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়া, বাজারের ব্যাগ হাতে নাতনির জন্য প্রতিদিন টাটকা মাছ বাজার থেকে আনা, অবসরে অজস্র বই পড়াই যাঁর নির্মল-জীবন। ইলিশ-চিংড়ি-চিকেন-মাটন পাতে পড়লে, আজও জমিয়ে খান। তেলেভাজা-পকোড়া খেয়ে বলেন, এই সব না খেলে কখনও শরীর ভালো থাকে? বছর দুয়েক পেসমেকার বসেছে হার্ট অ্যাটাকের কারণে। করোনা সংক্রমণের পাশাপাশি বেশ কয়েক মাস যার জন্য মানতে হচ্ছে কিছু বিধিনিষেধ।

অন্যদিকে ৭৮-এর মাধবীও সদা সাবলীল। করোনায় বহু চেনা মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ায়, আজ মন ভালো নেই তাঁর। কিন্তু জীবন চলছে স্বাভাবিক ছন্দেই। নিয়ম করে আজও বই পড়া, টিভিতে খবর-সিনেমা দেখা, কাউকে রান্না করে খাওয়ানোতে তাঁর কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু কী এমন সমস্যা হয়েছিল দুযুগেরও বেশি সময় আগে যার জন্য প্রেম করে বিয়ে, একসঙ্গে দুজনে বিন্দুর ছেলে, বাঞ্ছারামের বাগান, অন্তর্ধান, বনপলাশির পদাবলির মতো বহু ছবিতে অভিনয় করার পরও স্বামী-সংসার, দুই মেয়ে মিমি-ঝুমিকে রেখে স্বামী-ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন চারু? এমন প্রশ্নে ফোনে অত্যন্ত দৃঢ় মাধবীর কণ্ঠস্বর। আসলে কী জানেন, প্রত্যেক মানুষেরই একটা নিজস্বতা থাকে। আদর্শ থাকে। মিনার্ভা থিয়েটারে আত্মদর্পণ নাটকটা যখন করতাম সেখানে একটা গানের কথা ছিল, ‘বিপদে বিমনা হয়ো না। বিপদে যেও না বেপথে। পাবে না নিত্যধন। চলো বিবেকের সাথে। সেই গানের কথামতোই আমি আমার বিবেকের পথে হেঁটেছি।’ চলেছি অন্তরাত্মার টানে। সেই পথে চলতে গিয়ে আমি কখনও কাউকে আঘাত দিইনি। কারও ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করিনি। বরং অযথা অশান্তি থেকে সরে এসে, শান্তিতে থেকেছি। আর সরে এসে তো কিছু ভুল করিনি। সহ্যের সীমা অতিক্রান্ত হওয়ায় যখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিলাম, তখন গাছতলায় দাঁড়াতে হবে কিনা তা-ও জানা ছিল না। আজ আমি পরিপূর্ণ। দুই মেয়ে প্রতিষ্ঠিত। সুন্দর সংসার করছে। সমস্যা কোথায়!

কিন্তু দুযুগেরও বেশি সময় আলাদা থাকায়, স্বামী-স্ত্রীর মনে কি আজও কোনও অনুশোচনা-আফশোস উঁকি দেয় না? এমন কথায় নির্মলকুমারের আফশোস, গত ৪ ডিসেম্বর ছিল তাঁদের ৫২তম বিবাহবার্ষিকী। ইচ্ছে ছিল মাধবীকে নিয়ে দুদিনের অলস-ভাললাগা কাটাতে পুরী যাবেন। গিয়ে উঠবেন হানিমুনের স্মৃতিঘেরা বিএনআর হোটেল-এ। কিন্তু করোনার কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মাধবীর আফশোস, বড় মেয়ে হওয়ায় তার টানা-টানা বড় চোখ দেখে খুব ইচ্ছে ছিল মেয়ের নাম রাখবেন নীলাঞ্জনা। কিন্তু স্কুলে ভর্তির সময় দাম্পত্যে এমন সমস্যা হওয়ায়, তা আর রাখা গেল না। মেয়ে ডাকনাম মিমিই রয়ে গেল। ছোট মেয়ের ভালো নাম রঞ্জাবতী। কিন্তু বড় মেয়ে ভালো নাম নীলাঞ্জনা আর রেখে উঠতে পারলাম না। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে চারুলতার মন-কেমন সুর।