অঙ্ক নিয়ে গবেষণা ফের আমেরিকায় চললেন মধুমিতা

12001

মহম্মদ হাসিম, নকশালবাড়ি : অন্য কোনও বিষয় ভালো না লাগলেও অঙ্কটা বেশ লাগত। এই ভালোলাগার সুবাদেই অঙ্কের জটিল সমস্ত ধাঁধার জট ছাড়ানোটা তাঁর কাছে জলভাত হয়ে দাঁড়ায়। আর এই সুবাদেই নকশালবাড়ি রায়পাড়ার বাসিন্দা মধুমিতা রায়ের মার্কিন মুলুকে পাড়ি দেওয়া। সেখানকার ইউনিভার্সিটি অফ মেম্ফিস-এ অঙ্ক নিয়ে গবেষণার সুযোগ। ভারত থেকে একমাত্র হিসাবে মার্কিন মুলুকে গেলেও করোনার প্রকোপের জেরে গবেষণার কাজ শুরু করেই বাড়ি ফিরে আসতে হয়। ভাইরাসের প্রকোপ কমতেই মধুমিতা শনিবার ফের মার্কিন মুলুকের উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন।  নকশালবাড়ি তো বটেই, ঘরের মেয়ে এহেন সাফল্যে গোটা উত্তরই গর্বিত।

এপর্যন্ত পড়ে যদি মনে হয় অঙ্ককে অনায়াসে জয় করা মধুমিতার জীবন দারুণ, তাহলে একটু পিছন ফিরে দেখা যাক। নকশালবাড়ি বিডিও অফিসের পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে একটা টিনের চালার বাড়িতে বাবা-মাকে নিয়ে মধুমিতাদের তিন বোনের বসবাস। পাঁচজনের সংসারকে ঠিকমতো ডালভাতের জোগান দিতে বাবা গোপীনাথ রায়ের একসময় হিমসিম অবস্থা। মা ডলি রায় খড়িবাড়ি ভালুগাড়া এলাকার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। এই অবস্থায় সংসারের হাল সামাল দিতে গোপীনাথবাবু টিউশন দেওয়া শুরু করেন। তাকে কোনওমতে আঁকড়ে ধরেই মধুমিতার জীবন শুরু। তারকনাথ সিন্দুরবালা বালিকা বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে মাধ্যমিক পাশ। আগাগোড়া খুব মেধাবী না হলেও অঙ্কে দারুণ। কিন্তু আর্থিক অনটনের জন্য বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার সাহস হয়নি। শেষটায় স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভরসায় ভয় কাটল। ২০১২ সালে শিলিগুড়ি গার্লস হাইস্কুল থেকে ৭৭ শতাংশ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ। অঙ্কে অনার্স নিয়ে কোচবিহার এবিএন শীল সরকারি কলেজে ভর্তি। জয়েন্ট অ্যাডমিশন টেস্ট ফর এমএসসি (জেএএম) পরীক্ষায় পাশ করে পরবর্তীতে আইআইটি কানপুরে পড়ার সুযোগ পান। এই সময়ই সংসারে নানা প্রতিকূলতা। ডলিদেবীর পেটে টিউমার ও থাইরয়েডের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে সংসারের মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম। দুই মেয়ে মৌভাসি ও কৃপাকে ইংরেজি ও অঙ্ক নিয়ে কলেজে ভর্তি করতে গিয়ে গোপীনাথবাবু মধুমিতার আইআইটি কানপুরের খরচ জোগাড় করতে পারেননি। মধুমিতা অবশ্য হাল ছাড়ার পাত্রী নন। ২০১৬ সালে ফের জেএএম পাশ করে এবারে আইআইটি খড়গপুরে পড়ার সুযোগ পান। সেখান থেকে ২০১৭ সালে জেআরএফ পাশ করে অঙ্কে এমএসসি। অঙ্ক নিয়ে গবেষণা করতে ২০১৯ সালে জিআরই, টিওইএফএল নিয়ে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ মেম্ফিসে গবেষণার সুযোগ। একটি বৃত্তের পূর্ণায়ন।

- Advertisement -

কখনও হাল না ছাড়ার মধুমিতার জীবনের একটি ছোট্ট গল্প। কোচবিহার এবিএন শীল কলেজ থেকে এনজেপিতে নেমে পকেটে বাসভাড়ার টাকা না থাকায় বাড়ি ফেরার জন্য লোকাল ট্রেন ধরা। ট্রেনে নেশাগ্রস্ত কিছু যুবক তাঁর উপর চড়াও হয়। সঙ্গে ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে ট্রেনের বাইরে ফেলে দেয়। মধুমিতা চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নেমে কলেজের বই ভরা ব্যাগটি খুঁজে বের করেছিলেন। শেষটায় এক অটোচালকের সাহায্যে বাড়ি ফেরা। এই জেদ মধুমিতাকে আজ কতটা এগিয়ে দিয়েছে দেখে মধ্যবয়সি বাবার চোখে জল। গোপীনাথবাবু বলছেন, সংসারের হাল ধরতে হবে বলে বাবা আমাকে পড়াশোনা করতে দেননি। খাবার জুটত না। দুবেলা খাবারের বিষয়টি রীতিমতো স্বপ্ন ছিল। শেষে মাসির বাড়িতে পালিয়ে গিয়ে মাধ্যমিক পাশ করি। তিন মেয়ের স্বপ্নপূরণের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করব। তারকনাথ সিন্দুরবালা বালিকা বিদ্যালয়ে প্রাক্তন শিক্ষিকা কৃষ্ণা বর্মন বলেন, চেষ্টা ও অধ্যবসায় থাকলে কোথায় পৌঁছানো যায় মধুমিতা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।