অধ্যাপক হতে চায় পারডুবির করিনা

দেবাশিষ দত্ত, পারডুবি: দারিদ্রকে জয় করে মাধ্যমিকে মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের পারডুবি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী করিনা বেগম ৮৩ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। তার প্রাপ্ত নম্বর ৫৮৩। বাংলায় ৯১, ইংরেজিতে ৮০, অঙ্কে ৮৩, ভৌতবিজ্ঞানে ৭২, জীবনবিজ্ঞানে ৮৬, ইতিহাসে ৮৭ ও ভূগোলে ৮৪ নম্বর পেয়েছে করিনা।

পারডুবি উচ্চ বিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বরাবরের মেধাবী ছাত্রী করিনা বিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। বাবা আফিজুল মিঞা পেশায় টোটোচালক। তিনি বলেন, চার ছেলে-মেয়ে ও বৃদ্ধ মা-বাবা মিলে মোট আটজন সদস্যের পরিবার। সংসারে অভাব অনটন দুর করতে টোটো চালানোর পাশাপাশি হাটে হাটে সব্জি বিক্রি করেন ও বাড়ির সামনে একটি ছোট দোকান আছে।

- Advertisement -

করিনার মা মনিরা বিবি গৃহবধূ। বোন সানিয়া সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। আরেক বোন রিয়া পারভিন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ভাই মুনাফ হোসেন প্রথম শ্রেণির ছাত্র। আটজনের এই সংসারে অভাব অনটন দূর করেও মাধ্যমিকে ভালো ফলে উচ্ছসিত পরিবারের সদস্যরা। করিনার বাবা আফিজুল মিঞা বলেন, আমি নিজে পড়াশোনা শিখতে পারিনি, মেয়ের উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছি।

মেয়ে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চায়, কিন্তু আর্থিক অনটনের জন্য তা সম্ভব হবে না, তাই কলাবিভাগেই মেয়েকে পড়াশোনা করাতে চান আফিজুল সাহেব। এলাকার কৃতী ছাত্রী করিনা বেগম বলে, আর্থিক অনটনের জেরে বিজ্ঞান বিভাগের ইচ্ছে থাকলেও তা হবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওই বিদ্যালয় থেকেই কলা বিভাগে পড়াশোনা করব। ভবিষ্যতে কলেজের অধ্যাপিকা হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে।

পড়াশোনা চালিয়ে যেতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা সরকারি সাহায্যের আবেদন জানায় ওই কৃতী ছাত্রী। সে জানায়, টাকা পয়সার অভাবে তিনটি মাত্র টিউশন পড়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকারা সবসময়ই সহযোগিতা করেছেন। বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা জ্ঞানবালা বর্মন বাড়িতে এসেও করিনার পাশে থেকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করেছেন।

করিনার এই ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রতিবেশী ও পরিবারের সকলেই গর্বিত। ব্লকের পারডুবির এগারোমাইল এলাকায় করিনাদের বাড়ি। করিনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এগারোমাইল গোপাল দে স্মৃতি মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রে পড়াশোনা করছে, পরে নবম শ্রেণীতে এসে পারডুবি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। মাধ্যমিকের কৃতী এই ছাত্রী জানায়, পড়াশোনার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না। বাড়ির কাজে সহযোগিতা করতাম। মাঝেমধ্যে মায়ের সঙ্গে বাড়ির সামনের দোকানের কাজে সহযোগিতা করে ফাঁকা সময় পেলেই পড়াশোনা চালাতাম।

করিনা বলে, বাড়িতে প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা পড়ার টাকা ছিল না, তাই ব্যাচেই পরতাম। মাঝে মধ্যেই উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এর পড়াশোনা বিভাগ অনুসরণ করতাম। খুব সহজ ভাষায় বিষয়ভিত্তিক আলোচনা থাকায় অনেকটাই উপকার পেয়েছি। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। আমার প্রিয় বিষয় ইংরেজি। তাই ইংরেজি বিষয়ে অনার্স পরে ভবিষ্যতে নেট/সেট দিয়ে কলেজে অধ্যাপনা করতে চাই।

পারডুবি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, করিনা আমাদের বিদ্যালয়ের গর্ব। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে সে ভালো ফল করেছে। করিনা বরাবরই মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের। অনেক প্রতিকূলতাকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করেছে। তিনি বলেন, এর আগে এই বিদ্যালয়ে ৮৩ শতাংশ নম্বর কেউ পেয়েছে বলে নজরে আসেনি। আমরা বিদ্যালয়ের তরফেও সাধ্যমতো পাশে থেকে যতটা সম্ভব সাহায্য করব।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবছর মোট প্রায় ১৩ জন ৬০ শতাংশের উপরে নম্বর পেয়েছে। পাশের হারও ভালো রয়েছে বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি। মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক (এস.আই) মেহেবুব ইসলাম বলেন, যার লক্ষ্য ঠিক থাকে তাকে অভাব, দারিদ্র্যতা কোনওদিনই পিছিয়ে দিতে পারে না। করিনা মাধ্যমিকে ভালো ফল করে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করেছে। ও যাতে সরকারি সাহায্য বা বিভিন্ন স্কলারশিপ পায় , সেবিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সহযোগিতা করব।