সরকারি সাহায্য থেকে বঞ্চিত অপোষিত মাদ্রাসা

উত্তরবঙ্গ ব্যুরো : ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের আগে থেকেই সাচার কমিটির রিপোর্টকে হাতিয়ার করে রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিমদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অনুন্নয়ন নিয়ে বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরব ছিলেন। তৃণমূল রাজ্যের সংখ্যালঘুদের প্রতি বরাবরই বাড়তি নজরের কথা বলে এসেছে। এর জেরে শাসকদল ২০১১ সাল থেকে প্রতিটি ভোটেই সুফল পেয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের দাবি।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজ্যে বিজেপির বাড়বাড়ন্তের মধ্যেও সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটব্যাংক শাসকদলের অন্যতম বড় ভরসা। তা অক্ষুণ্ণ রাখতে সরকারে আসার আগে থেকেই মমতা এ রাজ্যে অন্তত ১০ হাজার মাদ্রাসাকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছিলেন। রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরটি এখনও তাঁর হাতেই রয়েছে। তবে মুখে বা কাগজপত্রে মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বহু কথা শোনালেও বাস্তব ছবিটা অন্য। এই সরকার আসার পর সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া রাজ্যের ২৩৫টি মাদ্রাসার বর্তমান বেহাল দশা দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে মাদ্রাসাগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত করতে সরকারে বসেই মমতা উদ্যোগ নেন। তবে মুখে ১০ হাজারের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সারা রাজ্যে মাত্র ২৩৫টি জুনিয়ার হাই ও হাই মাদ্রাসা স্বীকৃতি পায়। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গে ১২০টি মাদ্রাসা রয়েছে। উত্তরের জেলাগুলির মধ্যে কোচবিহারে সবথেকে বেশি ৫৪টি এই ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে। এছাড়া উত্তর দিনাজপুরে ৪৪টি, মালদায় ১০টি, জলপাইগুড়িতে ৫টি, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং আলিপুরদুয়ারে ৩টি করে এবং দার্জিলিং জেলায় ১টি মাদ্রাসা রয়েছে। ২০১১-১৩ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের তরফে অনুমোদন পাওয়া এই মাদ্রাসাগুলি স্বীকৃত অপোষিত মাদ্রাসা হিসাবে চিহ্নিত।

- Advertisement -

এই মাদ্রাসাগুলিতে ৪০ হাজারের বেশি পড়ুয়ার পাশাপাশি প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। তবে সরকারি স্বীকৃতি মেলার পর আট বছর পার হলেও অপোষিত হওয়ায় আজও এই মাদ্রাসাগুলির কোনও শিক্ষকই সরকারি বেতন পান না। পড়ুয়াদের অবস্থা আরও খারাপ। তারা সরকারি পাঠ্যবইয়ের বাইরে মিড-ডে মিল, পোশাক, ব্যাগ, জুতো, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, ঐক্যশ্রী স্কলারশিপের মতো কিছুই পায় না। এর জেরে ইতিমধ্যেই পড়ুয়ার সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। সরকার স্বীকৃত এই মাদ্রাসাগুলি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি সমস্তরকম ফান্ড সহ বিধায়ক ও সাংসদ কোটার টাকা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য পাবে বলে ২০১৩ সালে তৎকালীন রাজ্যের যুগ্ম সচিব পি বি সেলিমের এক নির্দেশনামায় বলা ছিল। পাশাপাশি, পড়ুয়াদের মিড-ডে মিলও পাওয়ার কথা। কিন্তু সেসব দূরঅস্ত। পড়ুয়াদের আজও মাদ্রাসাগুলিতে প্রায় ভাঙা ঘরেই পড়াশোনা করতে হয়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেশিরভাগই বেতন না পাওয়ায় তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সূত্রের খবর, সরকার মাদ্রাসা প্রতি তিনজন শিক্ষককে জন্য আট হাজার টাকা করে ছয় মাসের বেতন মাদ্রাসা কমিটিগুলিকে দিয়েছে। মাদ্রাসাগুলি ওই তিনজনের বেতন সমস্ত শিক্ষকের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ স্বীকৃত অপোষিত মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির রাজ্য সম্পাদক মহঃ জাভেদ মিয়াঁদাদ বলেন, সরকার যদি আমাদের বেতন ও পড়ুয়াদের কোনও সুবিধা না দিতে চায় তবে তা আমাদের বলুক। পাশাপাশি, বেসরকারি পরিচালনাধীন স্কুলগুলির মতো টিউশন ফি সহ অন্য ফি নেওয়ার অনুমতি দিক। স্বীকৃতি পাওয়ার পর আট বছর কাটতে চলেছে। তারও অনেক আগে থেকেই এই মাদ্রাসাগুলি চলছে। মূলত গ্রামাঞ্চলে চলা এই মাদ্রাসাগুলি যদি সরকারি সুবিধা না পায় তাহলে এগুলি আর বেশিদিন চালানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। রাজ্য মাদ্রাসা শিক্ষা অধিকর্তা আবিদ হাসান বলেন, অনুমোদনেই অপোষিত শব্দটি রয়েছে। ফলে অনুমোদন রয়েছে একথা যেমন ঠিক, পাশাপাশি এগুলি যে সরকার পোষিত নয় তাও মাথায় রাখতে হবে। তাই নিয়ম মতোই তারা কিছু পায় না। রাজ্য সরকারের গ্রন্থাগার ও জনশিক্ষা প্রসারমন্ত্রী তথা মাদ্রাসা সমন্বয় কমিটির (রাবেতা) রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী বলেন, মাদ্রাসার অনুমোদনের জন্য আবেদন করলে অনুমোদন দেওয়া হবে। এ পর্যন্ত প্রায় ২৪০টি মাদ্রাসাকে তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে রাজ্য সরকারের যা আর্থিক অবস্থা তাতে ওইসব মাদ্রাসাকে আর্থিক অনুদান দেওয়া খুব মুশকিল। তবুও মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যালঘুদের উন্নয়নে সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। (চলবে)