বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সৌজন্যে রোডিওয় সম্প্রচারিত মহালয়ার অনুষ্ঠান আজও একমেব অদ্বিতীয়

670

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: অবসান হল পিতৃপক্ষের। আজ মহালয়া। পঞ্জিকা মতে পিতৃপক্ষের শেষদিন আর দেবীপক্ষের সূচনা লগ্নই হল মহালয়া। এদিন ভোর থেকেই আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হওয়া শুরু হয়ে যায় দেবীর আগমন বার্তা। যে আগমন বার্তা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে রেডিওয় সম্প্রচারিত মহালয়া শীর্ষক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। পবিত্র এই দিনেই আপামোর বাঙালি তাঁদের পিতৃপুরুষের আত্মার তৃপ্তি কামনায় তর্পন সারেন। কার্যত এদিন থেকেই শারদোৎসবের ঢাকে কাঠি পড়ে গেল।

দেবীপক্ষের বিশেষ এই দিনটির ভোরে প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে সবথেকে বেশি কদর থাকে রেডিওর। দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের (টিভি) রমরমার যুগেও শুধুমাত্র এই একটি দিন শ্রবন যন্ত্র রেডিওর টিআরপি থাকে তুঙ্গে। কারণ দেবী পক্ষে মহিষাসুরমর্দিনীর মুর্চ্ছনায় মহালয়া শীর্ষক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান শুধুমাত্র রেডিওতেই সম্প্রচারিত হয়। যে অনুষ্ঠান আজও একমেব অদ্বিতীয়।

- Advertisement -

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অনবদ্য মহিমাকে সম্বল করেই আজও বাঙালির কাছে নস্টালজিক হয়ে রয়েছে রেডিওয় আকাশবাণী সম্প্রচারিত মহালয়ার এই বিশেষ অনুষ্ঠান। মহালয়ার অনুষ্ঠান রেডিওয় প্রথম সম্প্রচারিত হয় ১৯৩১ সালে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর চণ্ডীপাঠ আর পঙ্কজ কুমার মল্লিক, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ সহ অন্যান্য খ্যাতনামা শিল্পীদের কণ্ঠে ধ্বনিত আগমনী সংগীত বাঙালিকে আজও আবেগ প্রবণ করে তোলে। সেই আবেগ আজও ফল্গু ধারার মতো প্রবাহিত রয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির হাতধরে রেডিওর বিকল্প অনেক কিছু আবিষ্কার হয়েছে ঠিকই। তবে তা সত্বেও দেবীপক্ষের এই বিশেষ দিনটিতে আট থেকে আশি সকল বাঙালি রেডিওয় মহালয়ার মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান শুনে তারপর পির্তৃ পুরুষের উদ্দশ্যে তর্পণ সারতে পবিত্র জলাশয়ের ঘাটের দিকে রওনা হন।

রেডিও আবিস্কারের ইতিহাস বহু পুরানো। বিজ্ঞানী গুলিয়েলমো মার্কোনি ইতালীয় উদ্ভাবক এবং প্রকৌশলী যিনি বেতার যন্ত্রের সম্প্রচার পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনিই প্রথম রেডিওয় বাণিজ্যিক সার্ভিস চালু করেন। তারপর থেকে একটা যুগ গিয়েছে যখন প্রতিটি গৃহস্থ পরিবারে রেডিওর অসামান্য কদর ছিল। রেডিওয় প্রভাতি গানের সুর ঘুম ভাঙাতো অনেককেই। গল্প দাদুর আসর কিংবা ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান দলের ফুটবল ম্যাচ। সবেরই সম্প্রচার শোনার জন্য এক সময়ে রেডিওই ছিল একমাত্র মাধ্যম। পরবর্তীকালে দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের রমরমায় রেডিওর গুরুত্ব ও চাহিদা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যায়। বর্তমান প্রজন্মতো আবার রেডিও নামটাই ভুলে যেতে বসেছে। তবে এতকিছুর পরও মহালয়ার দিনের ভোরে তামাম বাঙালি আঁকড়ে ধরে সেই রেডিওকেই।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণে ভদ্রের সৌজন্যে মহালয়ার দিনটায় বাঙালির ঘরে ঘরে জানান দেয় রেডিওর উপস্থিতি। ‘জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণ ধারিণী, অভয়াশক্তি বল প্রদায়িনী তুমি জাগো।’ রেডিওয় ভেসে আাসা সেই হৃদয়স্পর্শী দেবী বন্দনা শুনে আজও নস্টালজিক হয়ে পড়েন আপামোর বাঙালি। তাই এই শুর ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় শঙ্খ ধ্বনী। দেবীকে আহ্বানের সূচনায় রেডিওয় সম্প্রচারিত মহালয়ার এই মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান আজও নিজস্ব স্বকীয়তায় কিংবদন্তী হয়ে রয়েছে।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সৌজন্যে রোডিওয় সম্প্রচারিত মহালয়ার অনুষ্ঠান আজও একমেব অদ্বিতীয়| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal India

আকাশবাণী সম্প্রচারিত মহালয়ার অনুষ্ঠান চির অমর করে রাখার নেপথ্য কারিগর হিসাবে গণ্য হয়ে আসছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। কবিতা পাঠ ও সংস্কৃত চর্চার প্রতি বরাবরই আলাদা টান ছিল হৃদয়স্পর্শী কন্ঠশ্বরের অধিকারী এই ব্যক্তির। ১৯২৮ সালে স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে বিএ পাস করার পর তিনি ফেয়ারলিপ্লেসে রেল দপ্তরের অফিসে চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু চাকরিতে তার মন বসছিল না। সেই বছরই চাকরি ছেড়ে দিয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র চলে এলেন বেতারে। এখানে নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে আসা বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কাছে একদিন এল মহালয়ার মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করার সেই সন্ধিক্ষণ। সেদিন সরাসরি সম্প্রচারিত মহালয়ার অনুষ্ঠান শুরুতেই আবেগ ঘন কণ্ঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বলা শুরু করলেন, ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জির, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা।’ শোনা যায় সেদিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণের আবেগ ঘণ কণ্ঠে ধ্বনিত এই শব্দমালা শুনে কার্যত ‘থ’ বনে গিয়েছিলেন আকাশবাণীতে উপস্থিত অন্য শিল্পীরা। শুধু ইশারায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে অভয় যুগিয়ে গিয়েছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক। আকাশবাণী সম্প্রচারিত সেদিনের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপামোর বাঙালির হৃদয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। কালজয়ী এই শিল্পী ইহলোক ত্যাগ করেছেন ঠিকই। তা বলে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে কেউ ভুলতে পারেননি। ভুলতে চানও না। তাই তাঁকে হৃদয় মাঝারে রেখেই মহালয়া এই বাংলায় সমাদৃত হয়ে আসছে।