মালদা শহরের আবর্জনায় ভরছে মহানন্দা, হারাচ্ছে নাব্যতা

441

হরষিত সিংহ, মালদা : ইংরেজবাজার পুরসভায় এখনও তৈরি হল না নির্দিষ্ট ডাম্পিং গ্রাউন্ড। শহরের বিভিন্ন ফাঁকা জনশূন্য এলাকা থেকে জলাশয়, এমনকি মহানন্দা নদীর তীরে নিয়মিত ফেলা হচ্ছে আবর্জনা। কোথাও আবার আবর্জনা ফেলে নদীর তীর ভরাট করা হয়েছে। নদীর তীরে বিশেষ করে শহরের বস্তি এলাকায় নিয়মিত নদীতে ফেলা হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার বর্জ্য। এর ফলে যেমন নদীখাতের গভীরতা কমে যাচ্ছে, তেমনই নদী তার স্বাভাবিক নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে।

মালদা শহরের বস্তিগুলির প্রায় ৪০ শতাংশ বাসিন্দা এখনও মহানন্দার তীরে শৌচকর্ম করছেন। যার জেরে বর্ষার মরশুমে নদীর জল বাড়তে থাকায় সমস্ত বর্জ্য গিয়ে মিশছে মহানন্দায়। এছাড়াও শহরের আধিকাংশ নিকাশিনালার নোংরা জল গিয়ে পড়ছে মহানন্দায়। নদীর মুখের নিকাশিনালাগুলিতে কোনও ব্যারিকেড নেই। ফলে নোংরা জলের সঙ্গে ভেসে আসা প্লাস্টিক, থার্মোকল থেকে বিভিন্ন কঠিন বর্জ্য নদীর জলে মিশছে। দূষিত হচ্ছে মহানন্দা নদীর জল। প্লাস্টিক দূষণ থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক দূষণে ভরে গিয়েছে মহানন্দা। তার থেকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন নদীর তীরবর্তী বস্তি এলাকার বাসিন্দারা। পরিবেশবিদরা জানাচ্ছেন, মহান্দার জল দূষণ থেকে মূলত চর্মরোগ, মহিলাদের চোখের সমস্যা, চুল পড়া রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মহানন্দার জল দূষণের জন্য সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাব ও প্রশাসনের উদাসীনতা রয়েছে। মালদা জেলার বিশিষ্ট পরিবেশবিদ অরবিন্দ ঘোষ বলেন, দশ বছর আগে মহানন্দার এমন অবস্থা ছিল না। ২০১৮ সালের বন্যার পর মহানন্দার দূষণ বাড়তে শুরু করে। অত্যধিক পরিমাণে ক্যারিব্যাগ ব্যবহারের ফলে সমস্যা বাড়ছে। নদীতে গিয়ে পড়ছে সমস্ত ক্যারিব্যাগ। জলের সঙ্গে মিথেন, হাইড্রোকার্বন, কার্বন ডাইঅক্সাইড বাড়ছে। মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য হচ্ছে মহানন্দার জল। আগামীতে মহানন্দার দূষণ আরও ভয়াবহ চেহারা নিতে পারে। তাই মানুষকে এখন থেকেই সচেতন হতে হবে।

- Advertisement -

মালদা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে মহানন্দা নদী। নদীর দুই পাড়ে রয়েছে দুটি শহর। দুই শহরের প্রচুর আবর্জনা নিয়মিত মহানন্দার তীরে ফেলা হচ্ছে। সবথেকে থেকে বেশি সমস্যা মালদা শহরের। শহরের ৮,৯ ও ১৩ সহ বিভিন্ন ওয়ার্ড এলাকায় একাধিক বস্তি রয়েছে। সেই সমস্ত বস্তি এলাকার সাধারণ মানুষ নিয়মিত নদীগর্ভে আবর্জনা ফেলছেন বলে অভিযোগ। এছাড়াও বস্তি এলাকার বহু মানুষের বাড়িতে গবাদিপশু রয়েছে। গবাদিপশুর মলমূত্র সমস্ত কিছু গিয়ে পড়ছে নদীতে। খরা মরশুমে নদীর জল কম থাকায় অধিকাংশ আবর্জনা জলের সঙ্গে মিশতে পারে না। তবে বর্ষায় নদীর জল বাড়তেই সমস্ত আবর্জনা মিশে নদীর জলকে দূষিত করে তুলছে। ইতিমধ্যে আবর্জনা পড়ে মহানন্দার বেশ কয়েক জায়গায় নদী খাত ভরে গিয়েছে। ফলে নদীর জল উপচে নদী পাড়ের বেশকিছু এলাকা জলের তলায় চলে গিয়েছে। ইংরেজবাজার পুরসভার প্রশাসক কমিটির সদস্য দুলাল সরকার বলেন, সাফাইকর্মীরাই আবর্জনা পরিষ্কার করেন। আমরা তাঁদের নির্দেশ দেব যেন নদীতে আবর্জনা না ফেলেন। প্রয়োজনে সাফাইকর্মীদের পরিবর্তন করা হবে। একসময় পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চকে সঙ্গে নিয়ে মহানন্দা বাঁচাতে উদ্যোগী হয়েছিলাম। একটি বৈঠক হয়েছিল সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে। কিন্তু নদীর অবস্থা খুব ভয়ানক। ট্রিটমেন্ট না করেই নদীতে নোংরা জল ফেলা হচ্ছে। একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার পরেও ডাম্পিং গ্রাউন্ড তৈরি করা যায়নি। এখন নোংরা নদীতে ফেলা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চের তরফে বলা হয়েছে, আমরা বিজ্ঞানমঞ্চের তরফে বিভিন্নস্তরের মানুষ থেকে পড়ুয়াদের নিয়ে জেলার বিভিন্ন সমস্যা বিষয়ক আলোচনা সভা করছি। মহানন্দা নদী সহ জেলার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আগামী ২০ জুলাই জেলা শাসককে ডেপুটেশন দেব। তবে বর্তমানে মহানন্দার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়েছে। সচেতনতার অভাবে মানুষ নিয়মিত নদীতে আবর্জনা ফেলছেন। এমনিতেই মহানন্দার একাধিক শাখানদী থাকায় মূল নদীতে জলের পরিমাণ খুব কম। তার উপর মানুষের সচেতনতার অভাবে এই নদীর ক্রমশ নাব্যতা হারাচ্ছে। এর জন্য মানুষের সচেতন হওয়ার প্রযোজন রয়েছে।