পিঠের স্বাদ বাঁচিয়ে রাখতে এখনও ভরসা ঢেঁকি

275

শ্রীবাস মণ্ডল, ফুলবাড়ি: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই তেরো পার্বণের মধ্যে একটি পার্বণ হল পৌষ পার্বণ বা পৌষ সংক্রান্তি। পৌষ সংক্রান্তি মানেই পিঠেপুলির দিন, রসনাপ্রিয় বাঙালির পিঠে পুলি তৈরি করা ও খাওয়ার মহাপার্বণ। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক সমাজের মানুষ এখন মিষ্টির দোকানের তৈরি করা রেডিমেড পিঠের দিকে ঝুঁকে পড়লেও গ্রামবাংলার পরিবারগুলি এখনও এই বিষয়ে সনাতনপন্থী রয়ে গিয়েছেন। এখনও গ্রামে পৌষ পার্বণে পিঠের স্বাদ বাঁচিয়ে রাখতে ভরসা ঢেঁকি। গ্রামের অনেক মহিলা পৌষ পার্বণে পিঠে তৈরিতে নিজের রান্নার কেরামতি দেখান। তাঁরা ডিমেড পিঠে নয়, নিজের হাতের পিঠে তৈরি করতেই বেশি পছন্দ করেন।

পিঠে-পুলি তৈরির প্রধান উপকরণ হল আতপ চালের গুঁড়ো। আর সেই গুঁড়ো পেতে ভরসা ঢেঁকি। আধুনিক পদ্ধতিতে মেশিনে চাল গুঁড়ো করা হলেও তার স্বাদ কম হয় এবং সব ধরণের পিঠে তৈরি হয় না বলে মনে করেন গ্রামের মহিলারা। তাই এখনও তাঁরা ঢেঁকিতে চাল ভাঙাতে বেশি পছন্দ করেন। পৌষ পার্বণ উপলক্ষ্যে বুধবার মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের বড় শৌলমারি ও ফুলবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন এলাকায় বাড়িগুলিতে ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করতে মহিলাদের ভিড় লক্ষ করা গিয়েছি।

- Advertisement -

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমানে গ্রামেও ঢেঁকি প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে কিছু বাড়িতে এখন ঢেঁকি রয়েছে। বছরের অন্য সময়ে ঢেঁকি অনাদরে থাকলেও পৌষ পার্বণে তার আদর বেড়ে যায়। তাই পৌষ পার্বণের দু’দিন আগেই ঢেঁকির জায়গা পরিষ্কার করে লেপে দেওয়া হয়। যেসব বাড়িতে ঢেঁকি আছে সেইসব বাড়িতে পৌষ পার্বণ বা পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন গ্রামের মহিলারা ভিড় জমান। সাঁচে তৈরি সাদা পিঠে, পাটিসাপটা, মাল পোয়া, কুলি পিঠে, ভাপা পিঠে সহ বিভিন্ন ধরণের পিঠে তৈরি করতে আতপ চালের গুঁড়োর কোনও বিকল্প নেই। তাই চালের গুঁড়োর তো দরকার হবেই।

পৌষ পার্বণে শুধু নিজেদের জন্য নয়, যাঁদের বাড়িতে গোরু রয়েছে গোরুকে খাওয়ানোর জন্য পৌষ পার্বণের দিন পিঠে তৈরি করা হয়। সেই সঙ্গে পৌষ পার্বণের দিন চালের গুঁড়ো গুলিয়ে কলকে ও লাউফুলের ছাপ দিয়ে উঠানে আলপনা দেওয়া হয়। গরুকে পিঠে খাওয়ানো ও কলকে দিয়ে ছাপ দেওয়ার জন্য আলাদা করে চালের গুঁড়ো রেখে দেওয়া হয়। পৌষ পার্বণের আগেরদিন রীতিমতো স্নান করে গ্রামের মহিলারা ঢেঁকিতে আতপ চালের গুঁড়ো তৈরি করেন।

সন্ধ্যা সরকার, কল্যাণী মণ্ডল, ভারতী সরকাররা জানান, একটা সময় ছিল গ্রামের অনেক বাড়িতে ঢেঁকি ছিল। সারাবছর ঢেঁকিতে কাজ হত। কিন্তু বর্তমানে ঢেঁকি বিলুপ্তির পথে। ঢেঁকির কদর কমে গিয়েছে। কিন্তু পৌষ পার্বণের আগে ঢেঁকির আদর ও কদর দুটোই বেড়ে যায়। তাঁরা জানান, পৌষ পার্বণে বাড়িতে পিঠে-পুলি তৈরি হবে। তার জন্য সেরা ঢেঁকিতে ভাঙানো আতপ চাল। তাঁরা বলেন, ঢেঁকিতে ইচ্ছেমতো আতপ চালের গুঁড়ো করে সেই চালের গুঁড়োর পিঠেপুলিও বেশ সুস্বাদু হয়। সারাবছর ঢেঁকির কদর না থাকলেও পৌষ পার্বণ এলে ঢেঁকির কদর থেকেই যাবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।