‘না ঘরকা, না ঘাটকা’, দুই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে রোজ রাত জাগে মাকড়হাট

272

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: ভারতের সিম কার্ড এখানে কাজ করে না। হাসপাতাল পৌঁছনোর আগেই ভুটভুটিতেই নবজাতকের জন্ম হয়। ইঞ্জিনচালিত ভুটভুটি সীমান্ত বাসীদের জীবনরেখা। বাইরের দুনিয়ার যোগাযোগের একমাত্র বাহন। তার ওপরে দুই পারের জওয়ানদের জোড়া যন্ত্রণায় রোজই ভোর নামে মহিষগাঁও সীমান্তের সংসারে। তারকাটার বেড়া ঘেঁষে ঘুড়ির ঘরগুলির দুয়ারে পা দিতেই হইচই পড়ে গেল বাসিন্দাদের মধ্যে। কে কার আগে সমস্যার কথা জানাবেন তা নিয়ে পড়ে গেল কাড়াকাড়ি।

উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদের চৌনগর গ্ৰাম পঞ্চায়েতের মাকড়হাট সীমান্ত। হাত বাড়ালেই বাংলাদেশ। ৩৬৫ দিন সেখানে ঘড়ির কাঁটা মেপে স্রেফ টিকে থাকার লড়াই করতে হয় প্রায় হাজার বারোশো মানুষকে। শুধু অগ্রহায়নের মিলন মেলা ছাড়া নতুন কোনো খবর প্রত্যহ রাত কোকিয়ে ওঠা পরিবারগুলির ভাগ্যে নেই। তা ঢের বোঝেন পঞ্চান্ন বছরের হামিদুর রহমান। তাই কেমন দেখছেন? কথাটা পড়তেই রীতিমতো ঝাঁজিয়ে জবাব দিলেন, ‘কেউ কিছু উপকার করতে পারবে না, তাই না হলে সন্ধ্যা সাতটার পর হাট করে বাড়ি ঢুকতে পারিনি অনেক দিন। বিএসএফ রাস্তায় আটকে রাতভর ক্যাম্পে বসিয়ে রেখে দিয়েছিল আমাকে। মেয়ে রাতে ভাত বেড়ে অপেক্ষা করছিল দেখা পর্যন্ত করতে দেয়নি।’

- Advertisement -

শুধু কি তাই সীমান্ত বাহিনীদের রাস্তা ধরে রোজ যাতায়াত করতে হয় তাদের। বিকল্প কোন রাস্তা আজও গড়ে ওঠেনি। ফলে একটু বেচাল হলেই হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় সীমান্তবাহিনীদের। রোজ রোজ এই কষ্ট আর সহ্য হয় না রীতিমত কান্না বুকে নিয়ে বাবার অপেক্ষায় রাত জাগা কিশোরী রোজিনা খাতুন বলতেও ছাড়লেন না। অন্যদিকে কাঁটাতারের ওপারে ভারত ভূখণ্ডই এপারের বাসিন্দাদের কয়েকশো আবাদি জমি রয়েছে অথচ সেখানে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষীদের (বিজিবি) রোষানলের মুখে প্রায়শই পড়তে হয় মহিষগাঁও, মাকড়হাট সীমান্ত বাসিন্দাদের।

বছর দুয়েক আগে চাষ করতে গিয়ে বিজিবি’র গুলিতে প্রাণ হারান ভারতীয় কৃষক। ফলে এপার আর ওপার মিলেমিশে যন্ত্রণার খাড়া ঝুলে থাকে। শেষ সীমান্তবাসী হওয়ায় দুর্ভাগ্যের কাটা নিয়েই প্রতিদিন অসম লড়াই করতে করতে দিন রাত কাটাতে হয়। একটাই প্রাথমিক স্কুল মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। নেই কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি দুপারের দুঃস্বপ্নের দৃশ্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় সীমান্তের বেড়ার পাড়বাসীদের।