মালদা কলেজে বাড়তি ফি নেওয়ার অভিযোগ ছাত্রছাত্রীদদের

494

মালদা : লকডাউন আবহে আগেই কলেজগুলিকে ফি মকুব অথবা কমানোর আবেদন করেছিল গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনলাইন পরীক্ষার বদলে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের শতাংশ নম্বর দেওয়ার নির্দেশিকা জারিও করে। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অধিকাংশ কলেজ সেই পথে হাঁটলেও, একেবারে উলটো পথে হাঁটছে মালদা কলেজ বলে পড়ুয়াদের অভিযোগ। ভর্তি ফি তো কমানো হচ্ছেই না, উপরন্তু কোর্স শেষ না করেই সমস্ত পাঠক্রমের উপর অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে বলে পড়ুয়াদের একাংশের অভিযোগ। যদিও এই সমস্ত অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মালদা কলেজের অধ্যক্ষ মানসকুমার বৈদ্য। তিনি বলেন, ‘ছাত্রছাত্রীদদের কাছ থেকে বাড়তি ফি নেওয়া হচ্ছে, এমনটা নয়। এই ফি গত ফেব্রুয়ারি মাসের ভর্তি ফি। সেটাই এখন নেওয়া হচ্ছে। এরপরেও যাঁদের অসুবিধা আছে, তাঁদের কলেজে আবেদন করতে বলা হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে হাফ ফি কিংবা ফুল ফি বিবেচনা করা হবে।’ গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা সমূহের নিয়ামক অপূর্ব চক্রবর্তী বলেন, ‘ভর্তি সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে আমরা আগামী ২৪ জুলাই সমস্ত কলেজ কর্তপক্ষকে নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক ডেকেছি। এই বৈঠকে আলোচনা করে সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

মালদা কলেজে স্নাতকোত্তর পাঠক্রম রয়েছে। এই পাঠক্রমে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনায় বিভিন্ন রকম ফি সব সময় বেশি থাকে। কারণ হিসেবে বলা হয়, যেহেতু অতিথি অধ্যাপকদের দিয়ে এই পাঠক্রম চালানো হয় তাই তাঁদের বেতন, ভাতা ও অন্য খরচের জন্য বাড়তি অর্থ নেওয়া হয়। মুখ খুললে পড়তে হচ্ছে শাসানির মুখে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধ উপেক্ষা করে মালদা কলেজে ফি মকুব করা হচ্ছে না। অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের কুড়ি শতাংশ নম্বর না দিয়ে অনলাইনে এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। সর্বোপরি কোর্স শেষ না করেই অনলাইন পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। যা আমাদের উপরে করোনা আবহে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। লকডাউনের মধ্যে মালদা কলেজে ছাত্রছাত্রীদদের ফি কমানো হচ্ছে না, উলটে পাঠক্রম সম্পূর্ণ না করেই সমগ্র পাঠক্রমের উপরে এমসিকিউ এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।এটা অমানবিক। লকডাউন চলছে। তাই আমরা কোনওরকম আন্দোলনের পথে যেতে পারছি না। আন্দোলনের পথে গেলে পরবর্তীতে চাকরির ক্ষেত্রে আমাদের পুলিশ ভেরিফিকেশনে সমস্যা হতে পারে এমন ভয়ও দেখানো হচ্ছে। পড়ুয়ারা আরও জানিয়েছেন, স্নাতকোত্তর স্তরে প্রত্যেক সেমেস্টারে ভর্তির জন্য ৫৫০০ করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। লকডাউন চলাকালীন এই ফি বহন করা ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের সামর্থ্যের বাইরে। ফি কমানোর অনুরোধ জানিয়ে কোন লাভ হয়নি।

- Advertisement -

অধ্যক্ষ বলেন, ‘ছাত্রছাত্রীদদের ফি থেকেই অতিথি শিক্ষকদের মাইনে দিতে হয়।’ পড়ুয়াদের প্রশ্ন, রাজ্য সরকার তো ছয়মাস আগেই অতিথি শিক্ষকদের মাইনে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তাহলে এখন এই কথা উঠছে কেন? তাঁদের আরও অভিযোগ, অধ্যক্ষ আরও জানিয়েছেন,আগে পরীক্ষা হোক। লকডাউন পর্ব এবং করোনা সমস্যা মিটে গেলে পড়ুয়াদের আবেদনের ভিত্তিতে ফুল ফি, হাফ ফি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাঁরা এই ফুল ফি, হাফ ফি আওতায় আসবেন তাঁদের স্কলারশিপের আবেদনে কলেজ কর্তৃপক্ষ সই করবে না। গত ১৭ জুলাই ছাত্রছাত্রীদদের নিয়ে এক ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে এই ধরনের অনেক ভয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ পড়ুয়াদের।

পড়ুয়াদের আরও অভিযোগ, করোনা আবহের জন্য গত মার্চ মাস থেকে কলেজ বন্ধ রয়েছে। অনলাইনে কিছুটা পড়াশোনা হয়েছে। তবে পাঠক্রম শেষ করা যায়নি। আমাদেরকে স্টাডি মেটেরিয়াল অনলাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, স্টাডি মেটেরিয়াল নিজেদের উদ্যোগে পড়ে নিতে হবে। সমগ্র বিষয়ে উপরে অনলাইনে পরীক্ষা দিতে হবে। এই পরীক্ষা হবে কুড়ি শতাংশের পরীক্ষা। সরকার নির্ধারিত ৮০-২০ ফর্মুলার মূল্যায়নের মধ্যে কুড়ি শতাংশ নম্বর আসবে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন থেকে। সমস্ত কলেজে শিক্ষকদের দেওয়া অ্যাসাইনমেন্টের ওপরে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কোথাও অনলাইন পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। রাজ্য সরকারও এর পরিপন্থী। এমনকি গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন পরীক্ষার বিপক্ষে।একমাত্র মালদা কলেজ অনলাইন পরীক্ষার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের নম্বর ধার‌্য করবে বলেই পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এখানেও অভিযোগ রয়েছে। এমন কিছু ক্লাস রয়েছে, যেখানে শিক্ষকদের একাংশ অনলাইনে ক্লাস নিতে পারেননি। নেটওয়ার্ক সহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে ক্লাস অনেক শিক্ষক নিতে পারেননি। ফলে পাঠক্রম শেষ হয়নি। আবার অনেকের স্মার্ট মোবাইল নেই। নেট পরিষেবা নেই। ফলে তাঁরা অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এখন কোর্স শেষ না করেই সমগ্র বিষয়ে উপরে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন হলে, সকলে সমূহ বিপদের মধ্যে পড়বেন। কেননা ৩ অগাস্ট থেকে ২১ অগাস্ট পরীক্ষার সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এটা ছাত্রছাত্রীদদের কাছে খুব চাপের বিষয় হয়ে যাচ্ছে।

ছাত্রছাত্রীদদের একাংশের অভিযোগ,একটি সেমেস্টারে ৫০ নম্বর করে ছয়টি বিষয়ে মোট ৩০০ নম্বরের পরীক্ষা। ২০ শতাংশ করে হলে মোট ৬০ নম্বর হয়। সেই ক্ষেত্রে ৮০ নম্বরের এমসিকিউ নেওয়া হচ্ছে কোন যুক্তিতে? বিভিন্ন বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন সিলেবাসের বোঝা কমানোর পক্ষে সওয়াল করছেন, সেখানে মালদা কলেজের সিলেবাস তো কমানো হচ্ছে না। উলটে সম্পূর্ণ সিলেবাসের উপরে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। অনেক শিক্ষক অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন না। তাঁরা প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা বলছেন। আবার আমরা যখন প্রযুক্তিগত কারণে অনলাইনে অ্যাপিয়ার হতে পারছি না বলে জানাচ্ছি, তখন আমাদের যুক্তি শোনা হচ্ছে না।

ছাত্রছাত্রীদদের অভিযোগ প্রসঙ্গে শাসকদলের ছাত্র সংগঠন টিএমসিপির জেলা সভাপতি প্রসূন রায় বলেন, ‘পড়ুয়াদের অভিযোগ যুক্তিযুক্ত। করোনা, ভাঙন, বন্যা প্রভতি পরিস্থিতির কারণে অনেকের হাতেই এখন টাকা নেই। অনেক অভিভাবক কাজ হারিয়েছেন। এই অবস্থায় কলেজ কর্তৃপক্ষকে মানবিক হওয়ার জন্য আমরা আবেদন জানিয়েছি।  অধ্যক্ষ আমাদেরকে আবেদনের ভিত্তিতে হাফ ফি ফুল ফি করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।  আমাদের আবেদনের পরেও যদি কোনও ছাত্রছাত্রীদ তাদের আর্থিক দুরবস্থা সত্ত্বেও ছাড়ের সুবিধা না পান, তাহলে আমাদেরকে জানাবেন।  আমরা এই ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নিব। এছাড়া অনলাইনে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন কেন এই বিষয়টিও আমি জানতে চেয়েছিলাম। অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, তাঁরা গত বছর থেকেই সমস্ত বিষয় অনলাইনের মধ্যে করছেন। এর ফলে তাদের ছাত্রছাত্রীদরা অনলাইনে যথেষ্ট সড়োগড়ো আছেন। তাই এই পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। যদি কোনও ছাত্রছাত্রী অনলাইন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারে, তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।’ ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি মান্তু ঘোষ বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীদদের অনেকেই এই ব্যাপারে আমাদের কাছে অভিযোগ করছেন। করোনা আবহে কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদদের প্রতি সহানুভূতিশীল না হলে আমরা লকডাউনের বিধি মেনে আন্দোলনে নামব।’

মালদা কলেজের অধ্যক্ষ মানসকুমার বৈদ্য বলেন,‘ বর্তমানে ইউ জি র অনলাইন এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে এই ক্ষেত্রে ভালো সাড়া মিলেছে। প্রথমদিনেই প্রায় ১৭০০ অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ ছাত্রছাত্রীদ অনলাইন পরীক্ষা দিয়েছে। যে সমস্ত ছাত্রছাত্রী অনলাইনে প্রক্রিয়ার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি, তাদের জন্য পরবর্তীতে বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে।’

গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বিপ্লব গিরি বলেন, ‘মালদা কলেজের পি জি পাঠক্রম স্বশাসিত। এক্ষেত্রে আমরা জোর করে কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের মানবিক হওয়া উচিত।করোনা অবহের মধ্যে ছাত্রছাত্রীদদের কথা ভেবে আমরা যেমন উদারতা দেখিয়েছি, তেমনি মালদা কলেজ কর্তপক্ষকেও ছাত্রছাত্রীদদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে কন্ট্রোলার বিশ্বরূপ সরকার বলেন, ‘এটি মালদা কলেজের ব্যাপার। আমরা বারে বারে অনুরোধ করছি ছাত্রছাত্রীদদের দিকটি দেখার জন্য। কেননা এই সময় অনেকেই আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন।’

তথ্য- প্রকাশ মিশ্র