এমএ কোর্স বন্ধ করতে চায় মালদা কলেজ

প্রকাশ মিশ্র, মালদা : স্নাতকোত্তর স্তরের পাঠক্রম বন্ধ করতে চাইছে মালদা কলেজে। কলেজ কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমানে তিনটি বিষয়ে এমএ পাঠরত শতাধিক ছাত্রছাত্রী চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।

বছর কয়েকক আগে মালদা কলেজে স্নাতকোত্তর পাঠক্রম চালু হয়েছিল। সম্পূর্ণ স্বশাসিত এই পাঠক্রমে বহু ছাত্রছাত্রী ভর্তিও হচ্ছিলেন। কিন্তু আচমকাই মালদা কলেজ কর্তৃপক্ষ এমএ পাঠক্রম বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এমএ পরীক্ষা নিয়ে বিতর্কের মাঝেই স্নাতকোত্তর পাঠক্রমই তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। তবে পাঠক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পিছনে একাধিক অজুহাত খাড়া করেছে মালদা কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যথেষ্ট নয়। কলেজের আর্থিক সমস্যাও রয়েছে। পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট কোর্স চালু থাকায় ন্যাকের মূল্যায়নে পদ্ধতিগত সমস্যা হচ্ছে। এমনকি সার্টিফিকেট ইস্যু করার ক্ষেত্রে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় অসহযোগিতা করছে বলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তুলেছে। এদিকে, মালদা কলেজের স্বশাসিত পাঠক্রম রাখা বা তুলে দেওয়ার বিষয়টি গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবেচনাধীন বিষয় নয় বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বিপ্লব গিরি।

- Advertisement -

মালদা কলেজকে ঘিরে নানা ক্ষেত্রে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। কলেজে বর্তমানে কোনও পরিচালনমণ্ডলী নেই। প্রশাসক হিসাবে রয়েছেন স্বয়ং জেলা শাসক। কলেজ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওপরে চাপিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। অথচ পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট পাঠক্রমের ক্ষেত্রে তাদের কোনও দায় নেই বলে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মালদা কলেজে পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট পাঠক্রম হচ্ছে স্বশাসিত। তাদের অ্যাকাডেমিক অটোনমি রয়েছে। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও যোগ নেই। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু মালদা কলেজের স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের সার্টিফিকেট ইস্যু করা।

গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশাপাশি মালদা কলেজ এবং বালুরঘাট কলেজে স্নাতকোত্তর পাঠক্রম পড়ানো হয়। এদের অ্যাকাডেমিক অটোনমি রয়েছে। মালদা কলেজে বাংলা, ইংরেজি এবং ইতিহাস বিষয়ে এমএ কোর্স করানো হয়। একশোর বেশি আসন রয়েছে। এখানে উপযুক্ত ফি দিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ন্যূনতম ফিজ লাগে, সেখানে মালদা কলেজে অটোনমি থাকার জন্য এমএ পড়াশোনা করতে গিয়ে একজন পড়ুয়াকে তিন বছরে প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো ফি দিতে হয়। পিজি পাঠক্রমের জন্য চুক্তিভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। এই সব শিক্ষকের বেতন ছাত্রছাত্রীদের ফি থেকে দেওয়া হত। এখন এই চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের বেতনের দায়ভার নিয়েছে রাজ্য সরকার। ফলে কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়ভার অনেকটাই কমেছে। অভিযোগ, তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ, ফি আদায় হচ্ছে না, ছাত্র ভর্তি কম হচ্ছে কারণ দেখিয়ে এতদিন ধরে চলা পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট পাঠক্রম তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালদা কলেজ কর্তৃপক্ষ। এর ফলে মালদা জেলার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের সুযোগ সীমিত হল বলে অভিযোগ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের।

গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ সমূহের পরিদর্শক অপূর্ব চক্রবর্তী জানান, মালদা কলেজের পিজি পাঠক্রমের জন্য স্বশাসন রয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলার নেই। তারা ইচ্ছে করলে পাঠক্রম রদ করতেই পারেন। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বিপ্লব গিরি জানান, মালদা কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের একটি চিঠি দিয়ে পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট কোর্সে ভর্তি রদ করার কথা বিবেচনার জন্য জানিয়েছে। মালদা কলেজের পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট পাঠক্রম চালানোর ক্ষেত্রে অটোনমি রয়েছে। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখানে হস্তক্ষেপের কোনও জায়গা নেই। তারা ইচ্ছা করলে কোর্স বন্ধ করতেই পারে। এক্ষেত্রে আমাদের কোনও বক্তব্য নেই। মালদা কলেজে স্নাতকোত্তর পাঠক্রম তুলে দেওয়ার ব্যাপারে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ জেলা সভাপতি প্রসূন রায় জানান, আমরা সব সময় ছাত্র স্বার্থে লড়াই করে যাচ্ছি। মালদা কলেজের অধ্যক্ষর সঙ্গে এব্যাপারে কথা হয়েছে। তিনি ছাত্র পাওয়ার সমস্যা এবং অর্থনৈতিক সমস্যার কথা বলেছেন। ছাত্ররা যদি এখানে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে, তবে অবশ্যই আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব। কোর্স যাতে চালু থাকে, তার জন্য অনুরোধ করব এবং ভর্তির ব্যবস্থা করব।

ইতিমধ্যে স্নাতকোত্তর স্তরে তৃতীয় সিমেস্টারের পরীক্ষা না নিয়ে চতুর্থ অর্থাৎ চূড়ান্ত সিমেস্টারের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সময়ে মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। এমনকি তৃতীয় সিমেস্টার পাস না করেই চতুর্থ সিমেস্টারে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। চতুর্থ সিমেস্টারে ভর্তি না করেই এই পরীক্ষা নেওয়া হয়।  কেননা তখনও তৃতীয় সিমেস্টারের পরীক্ষাই হয়নি। অবশ্য পরে তৃতীয় সিমেস্টারের পরীক্ষা হয়। এর প্রেক্ষিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ইউজিসি এবং রাজ্য সরকারের নিয়ম না মেনে পরীক্ষা নেওয়ায় সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে বেঁকে বসেছে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মালদা কলেজের পিজি ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোনওকালেই গৌড়বঙ্গ থেকে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয় না।

মালদা কলেজ কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তিন পাতার একটি চিঠি (চিঠির নম্বর ০৩/২০২০-২১) দিয়েছে। তাতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট পাঠক্রম রদ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। প্রথমে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীনে মালদা কলেজ সেল্ফ ফিন্যান্স পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট পাঠক্রম শুরু হয়। ২০১৪ সাল থেকে ইংরেজি ও ইতিহাস বিষয়ে পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট কোর্স  অনুমোদিত হয়। পরে বাংলা পাঠক্রম অনুমোদিত হয়। ২০১৭ সালে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীনে অ্যাকাডেমিক অটোনমি দেওয়া হয়। এর জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা অ্যাপ্লিকেশন ফি জমা দিতে হয়। ইতিমধ্যে দুটি ব্যাচ ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ সম্পূর্ণ হয়েছে। তাদের মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে একটি ব্যাচ পাঠরত অবস্থায় আছে। মালদা কলেজের অধ্যক্ষ মানসকুমার বৈদ্য চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরও জানিয়েছেন, এই সেলফ ফিন্যান্স পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট পাঠক্রম চালাতে গিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কলেজের টিচার্স কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে এই পাঠক্রম রদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। প্রশাসক তথা জেলা শাসক এই ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছেন বলে বলা হয়েছে।

কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট স্তরে ছাত্র ভর্তির সংখ্যা একেবারে কমে গিয়েছে। কলেজের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মানক সংস্থা ন্যাকের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট পাঠক্রমের বড় ভূমিকা থাকে। স্নাতকোত্তর পাঠক্রমের উল্লেখযোগ্য দিক হল, গবেষণা, পেপার পাবলিকেশন, পিএইচডি প্রভৃতি। এগুলির ওপর ন্যাকের মূল্যায়ন নির্ভর করে। অথচ আমাদের পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট স্তরে অটোনমি থাকার ফলে এগুলি হয় না। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের প্রাথমিকভাবে মার্কশিট কলেজ কর্তৃপক্ষ দিয়ে থাকে।  বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সার্টিফিকেট দেয়। কিন্তু বিভিন্ন ব্যাচের পাস আউট ছাত্রছাত্রীরা সার্টিফিকেট পাচ্ছেন না। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সার্টিফিকেট দিচ্ছে না। এমনটাই অভিযোগ তোলা হয়েছে। পাশাপাশি চিঠিতে অধ্যক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছেন, সম্প্রতি পাসআউট ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের চূড়ান্ত মার্কশিট এবং সার্টিফিকেট ইস্যু করা হোক। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চাপানউতোরের মধ্যে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রছাত্রীরা।