ধান না কাটলে জুটবে না ভাত, পেটের টানে হেঁটেই হাজির শ্রমিকরা

287

রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা: বোরো ধানে পাক লেগেছে। অন্যান্য বছর এই সময় বোরো ধান কাটার তোড়জোড় চলে। তবে এবার ছবিটা খানিক আলাদা। একে লকডাউন তার ওপর আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা। দুই মিলিয়ে বোরো ধান চাষিদের মাথায় হাত।

এই ভরা বৈশাখেই নিম্নচাপ ও দফায় দফায় বৃষ্টিতে জল জমেছে মাঠে-ঘাটে। বোরো ধানের জমিতেও গোড়া ডোবা জল। তড়িঘড়ি ধান কেটে ঘরে তুলতে না পারলে মাঠের ধান মাঠেই পচে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন আছে, তেমনিই অযথা বিলম্ব হলে ধান ঝরে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অথচ লকডাউনের জেরে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে। এই সময় পুরাতন মালদার বোরো ধান চাষিরা ঘোর সমস্যায় রয়েছেন।

- Advertisement -

আরও পড়ুন: কোটা ফেরত ছাত্রীরা স্থান পেল মালঙ্গি বনবাংলোয় 

অন্য বছর ধান কাটতে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের শ্রমিকরা এসে হাজির হন। কিন্তু এবার বিধি বাম। শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে ধান চাষিদের কাছে। তবে এর মধ্যেও পুরাতন মালদার সাহাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের দক্ষিণ ভাটরা এলাকায় দেখা গেল অন্য ছবি। পেটের টানে ধান কাটতে সেখানে হাজির হয়েছেন শ্রমিকরা। দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের সংস্থান করতেই প্রায় ৫০ কিলোমিটার হেঁটে দক্ষিণ ভাটরায় হাজির হয়েছেন মানিকচক ও ইংরেজবাজারের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩০ জন শ্রমিক।

প্রতিবছর ওই এলাকায় ধান কাটতে আসেন তাঁরা। তবে এবার লকডাউন চলায় তাঁদের আসার পথ ততটা মসৃণ ছিল না। ইংরেজবাজারের শোভানগর হোক বা মানিকচকের মথুরাপুর বা ধরমপুর-সেসব জায়গা থেকে ধান কাটতে পুরাতন মালদায় আসা খুব কঠিন ছিল। কোনও যানবাহন না থাকায় কাস্তে কোদাল ভোররাত থেকে মেঠো পথে হাঁটা শুরু করে শুক্রবার বিকেল নাগাদ পুরাতন মালদার ভাটরা গ্রামে এসে পৌঁছান তাঁরা। তবে সেখানে পৌঁছে দেখা দেয় অন্য সমস্যা। গ্রামের বাসিন্দারা শ্রমিকদের গ্রামের ভেতর ঠাঁই দিতে নারাজ হন। অথচ বোরো ধান কাটতে গেলে কমপক্ষে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় শ্রমিকদের থাকাটা জরুরি। ওই সময়ে তাঁরা সাধারণত জমির মালিকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে থাকেন। তবে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকায় গ্রামবাসীদের বাধায় এবার তা সম্ভব হয়নি। অগত্যা গ্রামের বাইরে নির্জন ফাঁকা মাঠে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে শুরু করেন ওই শ্রমিকেরা। বৃষ্টির কারণে সমস্যা হলেও পেটের দায়ে কষ্ট স্বীকার করে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে শ্রমিকদের।
শনিবার সেখানে গিয়ে দেখা গেল, গ্রামের শেষ প্রান্তে ফাঁকা মাঠের মধ্যে অস্থায়ী তাঁবু তৈরি করেছেন তাঁরা। শুধু পুরুষ নয়, মহিলারাও আছেন ওই তাঁবুতে। কোনওরকমে রান্নাবান্না করে সকাল সকাল মাঠে নেমে পড়েন গোলাম রসুল, রমজান মোমিনের মত শ্রমিকেরা। বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা রেখে শুধু রোজগারের আশায় তাঁরা এসে পৌঁছেছেন দক্ষিণ ভাটরা গ্রামে।

আরও পড়ুন: খালি করা হল সেন্টার, এখন থেকে প্রয়োজন বুঝেই সরকারি কোয়ারান্টিনে

রোশন বেওয়া নামে এক মহিলা শ্রমিক বলেন, ‘বাড়িতে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে আছে। লকডাউনের সময় আমাদের কোনও উপার্জন নেই। কীভাবে সংসার চলবে? কাজ না করলে খাব কী? তাই হেঁটে হেঁটেই এখানে চলে এসেছি ধান কাটতে। যেটুকু ধান আমরা মজুরি হিসেবে পাব তাই নিয়েই ঘরে ফিরব।’

রমজান মোমিন নামে অপর এক শ্রমিক বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের ভয় থাকায় গ্রামের মানুষ আমাদের ঠাঁই দিতে চাননি। তাই মাঠের মধ্যে তাঁবু খাটিয়ে থাকছি। খুব কষ্ট করে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু পেট চালাতে গেলে এ ছাড়া আমাদের আর কোনও গতি নেই।’ তাঁরা জানান, জমির যতটা ফসল কাটেন তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ মজুরি হিসেবে জোটে তাঁদের। দুই থেকে তিন সপ্তাহে এভাবে যতটুকু ধান মজুরি হিসেবে জোটে তাই নিয়েই তাঁদের ঘরে ফিরতে হয়। লকডাউনের সময়েও তাই শুধুমাত্র পেটের টানে ৫০ কিমি উজিয়ে ধান কাটতে হাজির হয়েছেন তাঁরা।