অপুষ্টির শিকার মেয়ে, অর্ধাহারে দিন কাটে মায়ের

সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট : উনুন দেখেই স্পষ্ট, বহুদিন হল হাঁড়ি চাপেনি তাতে। অথচ ঘরে রয়েছেন জ্বলজ্যান্ত দুটি মানুষ। খাবার তৈরির পাট চুকিয়ে অনাহারে থাকার অভ্যেসটা যেন তাঁরা কার্যত রপ্ত করে ফেলেছেন। পাড়ার লোকেরা যেচে পড়ে খাবার দিলে ভাগ্যে জোটে, নইলে শাকপাতা খেয়ে দিন কাটান মা-মেয়ে।

অপুষ্টিতে ভুগে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন দুজনেই। এক বালতি জল টানা কিংবা ভাত রান্না করাটাও এখন রীতিমতো দুরুহ ওই পরিবারের কাছে। স্বাভাবিকভাবেই কোনোদিন অনাহারে আবার কোনোদিন অর্ধাহারে দিন কাটছে তাঁদের। বিনা চিকিৎসায় ভাঙা ঘরেই পড়ে থাকেন সারা হেড়ে ও তাঁর মা তাসিয়া হেড়ে। যেন শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা! পরিবারের কাছে অবাঞ্ছিত ওই মা, মেয়ের করুণ কাহিনি অবশ্য গোটা গ্রামেরই জানা। তবুও হাল ফেরে না ওই মা-মেয়ের। তাঁদের সম্পর্কে বলতে গিযে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য  বলেন, ওঁদের দেখলে অবাক হই। ওঁরা কেমন করে যেন বেঁচে আছেন।

- Advertisement -

বালুরঘাট শহর লাগোয়া চকভৃগু গ্রাম পঞ্চায়েতের ধিচুপাড়া এলাকার বাসিন্দা সারা হেড়ে (৩৫) ও তাঁর বিধবা মা তাসিয়া হেড়ে (৬২)। তাসিয়াদেবীর স্বামী লুইসের মৃত্যু হয় বছর তিরিশেক আগে। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারে নেমে আসে আর্থিক অনটন। পরবর্তীতে তাঁর দুই ছেলে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই ছেলেরা আর মা কিংবা বোনের খোঁজ রাখেন না। ফলে কার্যত অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটতে শুরু করে মা-মেয়ের। মায়ের শরীরে যেমন বার্ধক্য নেমে আসে, ঠিক তেমনিভাবে মেয়ের শরীরেও বাসা বাধে অপুষ্টি। বর্তমানে মা ও মেয়ে দুজনেই নানারকম রোগের শিকার। বয়সের ভারে রুগ্ন শরীরে নড়াচড়া করতে সময় নেন তাসিযা হেড়ে, আর মেয়ে সারাও যেন অকাল বার্ধক্যের শিকার। মায়ের চেয়ে রুগ্ন তাঁর শরীর এবং দুর্বলতা আরও বেশি।

প্রতিবেশীরা জানান, কর্মক্ষমতা না থাকায় ওদের সংসারে আয়ের কোনো পথ নেই। এমনকি তাসিয়াদেবীর কপালে জোটেনি বার্ধক্য ভাতা কিংবা বিধবা ভাতাও। তাঁরা যেন শুধু ভোটার হয়ে বেঁচে রয়েছেন। নিজেদের রান্না করার ক্ষমতাও নেই। তাই প্রতিবেশীদের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে খাবার জোগাড় করে কোনোরকমে তাঁদের দিন পার করতে হয। যে দিন তাও জোটে না সেদিন শাকপাতা খেয়ে দিন গুজরান করেন দুজনে। তাসিয়া হেড়ে বলেন, কাজ করতে পারি না। শরীরের একদমই শক্তি নেই। মেয়েটা তো আরও দুর্বল। ছেলেরাও দেখে না। প্রতিবেশীরা সাহায্য করে বলেই বেঁচে আছি। কিন্তু ওরাই বা কত করবে। মেয়েটাকে একটু ভালো খাওযাতে পারলে হয়ত ও সুস্থ হয়ে উঠত। কিন্তু উপায় কই? শুধু মনে হয়, মরার আগে শান্তি নাই।

স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য পিটার বারু বলেন, ওদের পরিবারকে খুব ভালোভাবেই চিনি। খুব কষ্টের মধ্যে আছে ওঁরা। ওঁদের ভাতার জন্য আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনও সরকারিস্তরে কোনো সাড়া মেলেনি। দুজনের কারোর কোনো কর্মক্ষমতা নেই, আয় নেই, তবুও কী করে যে ওরা বেঁচে আছে সেটাই আশ্চর্যের। ওদের পাশে রয়েছি। সমাজসেবী তাপস চক্রবর্তী বলেন, ওই পরিবারটি অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিন কাটাছে। ওদের সামান্য কিছু সাহায্য করেছি।