ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোট গঠনের ডাক মমতার

183

কলকাতা: বুধবার নন্দীগ্রামে ‘হেভিওয়েট’ লড়াই। মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার মতদান নিয়ে যখন চড়ছে উত্তেজনার পারদ, তখনই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমমনোভাবাপন্ন বিরোধী নেতাদের একজোট করার উদ্যোগ নিলেন তৃণমূলনেত্রী। ১ এপ্রিলে ‘মহারণে’র আগেই ডাক দিলেন ঐক্যবদ্ধ বিরোধী ফ্রন্ট গঠনের।

দলীয় সূত্রের খবর, ২৮ মার্চ দেশের এক ডজনেরও বেশি প্রথমসারির বিরোধী নেতাদের চিঠি পাঠিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন মমতা। চিঠি গিয়েছে কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী, এনসিপির শারদ পাওয়ার, ডিএমকে’র স্ট্যালিন, সমাজবাদি পার্টির অখিলেশ যাদব, আরজেডি’র তেজস্বী যাদব, শিব সেনার উদ্ধব ঠাকরে, জেএমএম সুপ্রিমো হেমন্ত সরেন, ‘আপ’-র অরবিন্দ কেজরিওয়াল, বিজেডির নবীন পট্টনায়ক, ওয়াইএসআর চিফ জগন রেড্ডি, কে এস রেড্ডি, ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ফারুক আবদুল্লা ও পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতির কাছে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সম্মিলিত জোটফ্রন্টে সিপিআই (এমএল)র দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ডাক পেলেও, সিপিএম বা সিপিআই তাতে ডাক পায়নি বলে জানা গিয়েছে।

- Advertisement -

তিন পাতার ব্যক্তিগত চিঠিতে মমতা দিল্লি এনসিটি সংশোধনী বিল নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নির্বাচিত রাজ্য সরকারের ক্ষমতা হস্তগত করার লক্ষ্যে বিজেপি অনৈতিক ও অসাংবিধানিক নীতির খেলায় মেতে উঠেছে। সংসদে অগণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই বিতর্কিত বিল পাস করিয়ে রাজ্য সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে লেফটেন্যান্ট গভর্নর, এমনকি রাজ্যপালের হাতে তুলে দিচ্ছে কেন্দ্র৷ তারা কেন্দ্রীয় মুখপাত্র। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করবে, সেটাই স্বাভাবিক।’ মমতা বলেন, ‘দু-দুবার অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কাছে বিধানসভা নির্বাচনে হেরে ছল প্রয়োগ করে তাঁর হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে মোদি-শাহ জুটি। আজ যা দিল্লির সঙ্গে হয়েছে, কাল তা অন্য রাজ্যের সঙ্গেও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তৃণমূলনেত্রী।’

মমতা এও বলেন, ‘রাজ্যে রাজ্যে অশান্তি ছড়ানো ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে জিতে আসা বিভিন্ন সরকারে ‘সমান্তরাল’ সরকার গঠনের জন্য বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিজেপি এবং সংঘ ঘনিষ্ঠ রাজ্যপাল’দের। তাঁদের কাজ নিজের ক্ষমতা তথা পদের অপব্যবহার করে রাজ্য সরকারের প্রতিটি কাজের সমালোচনা ও তাকে অপদস্ত করা। তাঁদের মধ্যে দেখা গেছে নিরপেক্ষতার অভাব। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বিরোধী অ-বিজেপি রাজ্যগুলিকে হেনস্থা করার জন্য সিবিআই, ইডি সহ নানা সংস্থাগুলিকে সক্রিয় করেছে কেন্দ্র৷ ভোটমুখী রাজ্য তামিলনাড়ু ও বাংলাতেও শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির ধরপাকড়। রাজ্যে অশান্তি ছড়ানো ও বিরোধী দল গুলিকে ‘টার্গট’ করতেই এই পন্থা কেন্দ্রের।

মমতা জানিয়েছেন, অবিজেপি রাজ্যগুলির দীর্ঘকালীন বকেয়া এখনো ইচ্ছাকৃতভাবে বাকি রেখেছে কেন্দ্র৷ এর ফলে প্রভূত অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে রাজ্যগুলিকে। প্ল্যানিং কমিশন ভেঙে ‘নীতি আয়োগে’র গঠন করে বিজেপি রাজ্যগুলির উপর স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেছে বলেও প্রতিবাদ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মোদি-শাহ জুটির লক্ষ্য ‘এক দেশ, এক পার্টি’ গঠনের। সেখানে বিরোধীদের ঠাঁই হবে না। এছাড়া ‘দেশের সম্পদ’ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় বিলগ্নি ও বেসরকারিকরণ গড়ে সরকার ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতিদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি সরকার। পাশাপাশি কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ সম্পর্কের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে সেখানে একনায়কতন্ত্র চালানোই গেরুয়া শিবিরের উদ্দেশ্য বলে মনে করেন তৃণমূল নেত্রী।

তিনি বলেন, সময় এসেছে সমস্ত সমমনোভাবাপন্ন দলগুলির ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই তীব্র গেরুয়া আগ্রাসন প্রতিহত করার। দেশের সংহতি ও সংবিধান রক্ষার জন্য সকলকে একজোট হওয়ার ডাক দেন তিনি। বিধানসভা নির্বাচনের পরেই জোট ফ্রন্টের কর্মসূচি ও নির্নয় নিয়ে বৈঠকে বসার জন্য আহবান জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার এই চিঠি নিয়ে দুই রকম মতধারা উঠে এসেছে। বিজেপির বক্তব্য, এই নির্বাচনে সমূহ পরাজয় জেনেই মমতা তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের ডাক দিয়েছেন। জাতীয় রাজনীতিতে নিজ অস্তিত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে বিরোধী মুখ হয়ে উঠতে চান তিনি৷

পর্যবেক্ষক মহলের একাংশের অবশ্য দাবি, রাজ্য বিধানসভায় জয় নিয়ে আশাবাদী মমতা এবার ২০২৪ এর ‘দিল্লি জয়ে’র লক্ষ্যে উঠে পড়ে লেগেছেন। কিন্তু জাতীয় স্তরে একার ক্ষমতায় বিজেপির অপসারণ সম্ভব নয় বলেই গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক নীতিতে বিশ্বাসী দলগুলিকে ফের এক ছাতার তলায় আনতে উদ্যোগী তিনি। প্রায় ১৪ জন শীর্ষ বিরোধী দলনেতাকে একসূত্রে বাঁধার এই চেষ্টা তারই পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া মাত্র। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তালিকায় ‘অতি বাম’ সিপিআই-এমএল ডাক পেলেন, অথচ বামফ্রন্ট উপেক্ষিত রয়ে যাওয়ায় শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিশেষজ্ঞ’দের মতে, নির্বাচনের মুখে সিপিএম-সিপিআই’কে উহ্য রেখে মমতা বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে তাঁর চিরকালীন অনাস্থার’ই পরিচয় দিয়েছেন।