একুশের মহারণে মহিলা ভোটে আস্থা মমতার

কলকাতা : রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর জমানায় স্ত্রী-শক্তির জাগরণে ব্যাপক জোর দিয়েছে রাজ্য সরকার। মহিলাদের জন্য নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্প নিয়ে তাঁদের সমাজের সামনের সারিতে এনে সম্মানিত করার লাগাতার চেষ্টা করে যাচ্ছে রাজ্য। একদিকে যখন একুশের মহারণে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের তৈরি হওয়া ক্ষোভ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি, তার উলটো দিকে রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির প্রচারকেই ভোটে হাতিয়ার করতে চাইছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিহারে নীতীশ কুমারের নেতত্বাধীন এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভের ঝড়কে রুখে দিয়েছে বেশি সংখ্যায় মহিলাদের ভোটদান। করোনা আবহেও বাড়ির বাইরে বেরিয়ে ওই রাজ্যে ৫৯.৬ শতাংশ মহিলা ভোট দিয়েছেন। পুরুষ ভোটাররা ৫ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছেন। এ রাজ্যে ভোটার তালিকায় মহিলাদের সংখ্যা ৩.৪০ কোটি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পুরুষ ভোটারদের ছাপিয়ে মহিলা ভোটারের ৮১.৭ শতাংশ ভোট দিয়েছিল। এবার তাই তৃণমূল কংগ্রেস মহিলাদের উন্নয়নে তাদের প্রকল্পগুলি আরও বেশি করে প্রচারে আনতে চাইছে।

এ রাজ্যে মহিলাদের কল্যাণে বহু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রকল্প কন্যাশ্রী। রাজ্য ও দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই প্রকল্প বারবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজ্যের নারী ও শিশুবিকাশ এবং সমাজকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী শশী পাঁজা জানিয়েছেন, এক-আধটি নয়, তৃণমূল জমানায় মহিলাদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে রাজ্য সরকার ১৬টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কন্যাশ্রী প্রকল্পের মতো কেন্দ্রীয় সরকারেরও নারীকল্যাণে বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু সেই প্রকল্পে মাত্র ৫৬২ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। অথচ কন্যাশ্রী প্রকল্পে এ পর্যন্ত রাজ্যের ৬৭ লক্ষ মেয়ে উপকৃত হয়েছে। খরচ হয়েছে ৯,৩৮৯ কোটি টাকা। রূপশ্রী প্রকল্পে এ রাজ্যে ৫ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫২৮ জন মেয়ে উপকৃত হয়েছে। খরচ হয়েছে ১,৪০০ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে ১৮ বছর বয়স হলেই মেয়েদের বিয়ের জন্য তাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ২৫ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ১,৫৯০টি হাসপাতালে ১ কোটি ৪২ লক্ষ পরিবারকে চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই প্রকল্পের কার্ড ইস্যু করা হয়েছে বাড়ির মেয়েদের নামে। মন্ত্রীর দাবি, এটা নারী ক্ষমতায়নের উদাহরণ।

- Advertisement -

১০০ দিনের কাজে এ রাজ্যের সাফল্য কেন্দ্রীয় সরকারও বারবার স্বীকার করেছে। লকডাউনের সময় গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে ১০০ দিনের কাজ। এ রাজ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই কাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ। মন্ত্রী জানিয়েছেন, ১০০ দিনের কাজে মোট ২ কোটি ৯৭ লক্ষ লোক উপকৃত হয়েছেন। তার মধ্যে মহিলার সংখ্যা ১ কোটি ২৭ লক্ষ। খাদ্যসাথী প্রকল্পে ডিজিটাল র্যাশন কার্ডও দেওয়া হয়েছে পরিবারের কর্ত্রীর নামে। বাংলার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ আর দশটা রাজ্যের থেকে আলাদা। এই ধরনের র্যাশন কার্ড রাজ্যের ৫৮ লক্ষ পরিবারকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও জাগো বাংলা প্রকল্পে ৭ লক্ষ ৪৭ হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠী উপকৃত হয়েছে। এতে রাজ্যের খরচ হয়েছে ৩৩৭ কোটি টাকা। শিশুমৃত্যু ঠেকাতে বাড়িতেই সন্তান জন্ম দেওয়ার জায়গাগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওইসব এলাকায় সন্তানসম্ভবাদের মায়েদের পিকনিক কর্মসূচির আওতায় নিকটবর্তী লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রেখে তাঁদের সন্তানের জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সুন্দরবন ও পাহাড়ের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় কিছু অপেক্ষাগৃহ তৈরি করা হয়েছে। সেইসব জায়গায় সন্তানসম্ভবা মায়েদের আগে থাকতেই এনে রাখা হচ্ছে। দিনে দুটি করে সন্তানের জন্ম হয় সেখানে।

একুশের নির্বাচনকে সামনে রেখে মহিলা ছাড়াও প্রতিটি ক্ষেত্রের মানুষের জন্য রাজ্য সরকার কী কী করেছে তার বিস্তারিত পরিসংখ্যান জানাতে তৃণমূল ভবনে প্রতিদিনই দলের মুখপাত্ররা হাজির থাকছেন। টানা ২০ দিন ধরে মুখপাত্ররাই প্রচার চালাবেন। সর্বভারতীয় আইটি সেলের প্রধানকে রাজ্যের সহকারী পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে বিজেপি বুঝিয়ে দিয়েছে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের ঝড় তুলবে। তার পালটা প্রচারের স্রোত গড়তেই তৃণমূলের মুখপাত্রদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।