দলের শুদ্ধিকরণেই দলত্যাগীদের জন্য ছাঁকনি দরকার মমতার

455
ফাইল ছবি।

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়  

গায়ে ফোসকা-পড়া গরম শুরুর আগেই রাজধানী দিল্লিতে এখন বর্ষার আমেজ। করোনার দৌলতে কি না কে জানে, বর্ষা এবার পা চালিয়ে ঢুকে পড়েছে। সেই আমেজে ও আবেশে মাখামাখি আমি ভাবছি, সংকট কত ভাবে কত রূপে হাজির হয়। মাসতিনেক আগেও যাঁদের জোরে বাংলা ভাসিয়ে দেওয়ার তাল ঠুকছিলেন অপরাজেয় বিজেপি নেতৃত্ব, তাঁরা এখন উপলব্ধি করছেন সেই চিরন্তন সত্য, ভাড়াটে সৈনিকরা যুদ্ধ জয়ে ব্যর্থ হয়। বীরের মতো মরার গৌরবও তারা অর্জন করে না, কেন-না পরাজয় অবধারিত দেখলে হয় তারা পালায়, নয়তো আত্মসমর্পণ করে।

- Advertisement -

বাংলায় সেটাই ঘটেছে। আরও ঘটার ইঙ্গিতও আসছে অহরহ। গণতন্ত্রে এক পক্ষের ঘর খালি হলে অন্য পক্ষের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু দলত্যাগীদের উপাখ্যান শাসকদলের বলিরেখা গাঢ় করে তুলেছে। বিজেপির অস্বস্তি তৃণমূলের স্বস্তির কারণ হয়ে ওঠেনি। বঙ্গীয় রাজনীতিতে বহু বছর এমন নাটকও মঞ্চস্থ হয়নি। আজ যা হচ্ছে, বিজেপির কাছে তা যদি হয় অসম্মানের ও গ্লানির, তৃণমূলের কাছে তবে তা অভিনব সমস্যার বিপুল বোঝা। বিজেপির ঘরের সমস্যা এই মুহূর্তে তৃণমূলের সমস্যার বস্তার ওপর শাকের বাড়তি আঁটি।

ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদলের ঘটনা পূর্ণিমা-অমাবস্যায় বাতের ব্যথা চাগাড় দেওয়ার মতোই স্বাভাবিক। কোনও দলই এই অসুখ সারাতে আগ্রহী নয়। শেষ যুগ পেরিয়ে নির্বাচন কমিশনও আজ সিবিআইয়ের মতো খাঁচায় বন্দি তোতা। নিজস্ব গরজ নেই, কেউ চাপও দেয় না! তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোও জানে, কোনও সময় দলত্যাগের এই অসুখ তাদের সুখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কাজেই সম্ভাবনার টুঁটি টিপে ধরতে কেউ আগ্রহী নয়। রাজীব গান্ধি একটা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতেও যে বিস্তর ফাঁক, সময়ে সঙ্গে সঙ্গে তা দৃশ্যমান। সেই ফাঁক ভরানোর কাজে যাদের এগিয়ে আসার কথা, যারা তা করতে পারত, তারা কংগ্রেস-মুক্ত ভারত গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে দলবদলে সব ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে। গণতন্ত্রের পঞ্চত্বপ্রাপ্তিতে তাদের কিছু যায় আসে না যেহেতু তাদের রাজত্বে গণতন্ত্রটাই গিলোটিনে ঘাড় গুঁজে ঘচাং ফু হওয়ার অপেক্ষায়। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। রাজ্যে রাজ্যে, বিশেষ করে ভোটের আগে, মঞ্চস্থ হচ্ছে আদ্যিকালের সেই নাটক।

বাংলায় এখন যা ঘটছে তা অবশ্য উলটোরথের যাত্রা। ভোটের আগে দলবদলের উপাখ্যান নিয়ে এই পত্রিকায় প্রাইভেট জেট মাহাত্ম্যের বর্ণনা করেছিলাম। বিস্মিত হয়েছিলাম শাসক-দলীয় বৈভব দেখে! রাজ্য দখলের মরিয়া প্রচেষ্টায় দলবদলের মায়াজাল সৃষ্টিতে দমদমে প্রাইভেট জেট পাঠানোর মতো ঘটনা অতীতে ঘটেনি! যাঁদের জন্য সেই গুরুত্ব, অভিনবত্ব ও সম্মান, তাঁরা কতটা তার যোগ্য সেই প্রশ্ন ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল বৈভবের অসম ও অশ্লীল প্রদর্শন। যেভাবে ও যে হারে দলত্যাগ ঘটিয়ে বিজেপি দলভারী করেছিল, তাতে রাজনীতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল ঔদ্ধত্য, বাহুবল ও অর্থের ঝনঝনানি। বাংলার ইতিহাসে তেমন কখনও ঘটেনি।

সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! অসাধারণ পলিটিকাল অপটিক্স! অনন্য মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। আধুনিক চাণক্যরা ভোটের আগে এই ধরনের এক পরিবেশ বা মহল তৈরি করেন। প্রচারে ভর দিয়ে এমন একটা হাওয়া তোলেন, সবাই ভাবতে ভালোবাসে লড়াইটা শুরুর আগেই শেষ। এপিটাফ লেখাটাই শুধু বাকি। রাজ্যে বিজেপি ঠিক সেটাই করতে চেয়েছিল। হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছিল দিদির ঘুড়ি ভোঁকাট্টা। তা করতে গিয়ে তারা নিজেদের ক্ষমতাকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি অবহেলা করেছিল প্রতিপক্ষের শক্তি ও বাঙালির স্বাভিমানকে। ভাত ছড়িয়ে কাক জড়ো করার মতো বৈভব ও অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে ভাড়াটে সৈন্য জোগাড়ে তারা শক্তিক্ষয় করেছিল। নেতা সংগ্রহে বাছবিচার রাখেনি। উড়তে উড়তে সশব্দে পতনের পর এখন একদিকে চলছে বোধোদয়ের পালা, অন্যদিকে মাথা মুড়িয়ে ঘরে ফেরার আর্তি। রাজনৈতিক নাটকে এও এক অভিনব অধ্যায়। বৈচিত্র‌্যপূর্ণ ভারতে কোনও রাজনৈতিক নাটকে এমন ধরনের অঙ্ক আগে কখনও অভিনীত হয়েছে বলে শুনিনি। দলত্যাগীদের বিবেকের দংশন এত দ্রুত হতে পারে, নিঃশ্বাস এত তাড়াতাড়ি আটকে যেতে পারে, কারও তা জানাও ছিল না।

এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য ধাঁচের এক সংকট। অভিনব এক সসেমিরা হাল। কী করবেন তৃণমূলেশ্বরী? মমতায় ভেসে মায়াময়ী হয়ে ক্ষমার প্রতিমূর্তি সাজবেন? নাকি ক্ষমাহীন কাঠিন্য বজায় রেখে বোঝাবেন, শাস্তিই দলত্যাগী বিশ্বাসঘাতকদের স্বাভাবিক বিচার? কঠিন, বড় কঠিন এই নির্ণয়। আরও কঠিন এই কারণে, তিনিই যে এদের ধাত্রী!

মমতার পক্ষে এ এক অদ্ভুত ট্র‌্যাপিজের খেলা। এ খেলায় তিনি না নামলেও পারতেন। বাধ্য হয়েছেন তিনটি কারণে। প্রথমত, দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে যাঁরা আরও একবার খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে চাইছেন, তাঁরা সবাই তাঁরই পক্ষপুটে লালিত। তিনিই তাঁদের জননী। দ্বিতীয়ত, এই খেলা দিয়ে প্রতিপক্ষের অসাড়ত্বও তিনি প্রকাশ করে দিতে পারছেন। দেশের প্রধান সেবককে যেভাবে তিনি বেআব্রু করেছেন, গত সাত বছরে সেই হিম্মত আর কেউ দেখাতে পারেননি। তৃতীয় কারণটি তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সেই শুরু থেকে যাঁরা তাঁকে পর্যবেক্ষণ করে আসছেন, তাঁরা জানেন, একদা যাঁদের হাতে তাঁকে পদে পদে অসম্মানিত হতে হয়েছে, কীভাবে তিনি তাঁদের বশীকরণ ও আজ্ঞাবহ করে তুলেছেন। করুণা করেছেন। তাঁর কাছে এ এক অদ্ভুত তৃপ্তি। রাজনীতিতে পূর্ণচ্ছেদ নেই সবার জানা। কিন্তু সব পরম শত্রুকে সর্বদা যে অনুগত ও অনুগামী করে রাখা যায় মমতা তার বিরল উদাহরণ। এযাবৎকাল ধরে তিনি সেটাই করে আসছেন। তাঁর রাজনৈতিক বৃত্তে আলো ফেলুন। দেখবেন, এমন অগুনতি চরিত্র ফুটে উঠছে।

এবারেও সেই ধারাবাহিকতা বহমান থাকবে এবং একেক জনকে একেক সময় নিজের শর্তে দলে ফিরিয়ে তৃণমূল নেত্রী আত্মপ্রসাদ লাভ করবেন। চিরকাল এটাই তিনি করে এসেছেন। এটাই তাঁর রাজনীতির ধরন। তিনি জেদি, সাহসী, লড়াকু কিন্তু মমতাময়ীও। প্রতিহিংসাপরায়ণতা তাঁর অভিধানে ঊহ্য। ক্ষমা তাঁর স্বভাবে লেপটে রয়েছে আজন্মকাল।

দলত্যাগীদের দলে ফেরানোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ থাকাটা স্বাভাবিক। এঁদের সাহচর্য ছাড়াই যাঁরা তাঁকে বিজয় মুকুট পরিয়েছেন, তাঁদের হক আছে বিরোধিতার। রাজনীতিতে সামাজিক তিরস্কার এভাবেই হয়। বিরোধিতার মধ্য দিয়ে ক্রোধেরও নিষ্ক্রমণ হয়। এসব সহ্য করে রাজনীতির প্রবাহে গা ভাসানো সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। পারসেপশন বা ধারণা যেখানে প্রথম ও শেষ কথা, জনগণই সেখানে শেষ বিচারে প্রাসঙ্গিক। নেত্রী কাউকে কাউকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিতেই পারেন। দেবেনও। কারা তা পাওয়ার যোগ্য, সেই মানদণ্ডও তিনি ঠিক করে দিয়েছেন শুরুতেই। দলটা তাঁর। তিনিই একমাত্র যন্ত্রী।

এবারের ভোটের রাজনীতি ও বিজেপির আগ্রাসন মমতাকে এক বিরাট সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এনে দিয়েছে দলের সার্বিক শুদ্ধিকরণের বিরাট সুযোগ। প্রার্থী পছন্দের সময় থেকে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহারে তিনি সচেষ্ট থেকেছেন। দলত্যাগীদের ফেরানোর ক্ষেত্রে সেই ছাঁকনির প্রযোগ সমাজে একটা ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। অমৃত ও গরলের ফারাকটা বুঝিয়ে দিতে পারবেন। সুযোগটা হারানো ঠিক হবে না।

(লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক)