কোল ব্লকে ১০০ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ মমতার

273

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, নয়াদিল্লি: দেশের ৪১ টি প্রধান কোল ব্লকের বাণিজ্যকরণ বা ‘কমার্শিয়াল মাইনিং’র জন্য নিলাম প্রক্রিয়ার কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এবার তার বিরুদ্ধে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৫ জুন, বৃহস্পতিবার, মোদিকে চিঠি লিখে বিষয়টির কড়া বিরোধিতা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনটাই দাবি রাজ্য সরকারি সূত্রের।

মুখ্যমন্ত্রীর তরফে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে পাঠানো দু’পাতার সেই চিঠিতে দুটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। সূত্রের দাবি, কোল ব্লকের নিলাম বা ১০০% বিদেশী বিনিয়োগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন মমতা। পাশাপাশি কলকাতা থেকে কোল ইন্ডিয়ার হেড অফিস ভিনরাজ্যে স্থানান্তরিত করারও বিরোধীতা করেছেন তিনি।

- Advertisement -

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, কয়লা ক্ষেত্রে বাণিজ্যকরণ বা ১০০% বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ প্রধানমন্ত্রীর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ সংকল্পের পরিপন্থী। কয়লা ক্ষেত্র ভারতের ঐতিহ্য ও গৌরবময় সংস্কৃতির অঙ্গ। বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা উৎপাদক দেশ ভারত ও ভারতের পূর্বাঞ্চলে সর্বাধিক কয়লা উৎপাদন হয়ে থাকে। কয়লা উৎপাদনে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার লভ্যাংশ রয়েছে কোল ইন্ডিয়ার। তাদের কাছে থাকা লাভের অংশ ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে সেই কয়লা উৎপাদন ক্ষেত্রে বাণিজ্যকরণ বা ১০০% বিদেশী বিনিয়োগ দেশের সামগ্রিক কয়লা ক্ষেত্র’কে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়ার সামিল।

মমতা বলেন, ‘এই বিদেশি বিনিয়োগের ফলে দেশীয় উৎপাদন মার খাবে যা প্রধানমন্ত্রীর ‘আত্মনির্ভর’ ভারতের পরিপন্থী।‘ মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলি কিন্তু এখন ‘রিনিউওয়াল এনার্জি’ বা পুনঃব্যবহার যোগ্য জ্বালানীর দিকে বেশি করে ঝুঁকছে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় কোল ব্লকের ভাণ্ডার খুলে দেওয়া মানে তা শুধু ভুল হাতে যাওয়া নয়, কয়লা ক্ষেত্র’কেও চরম সঙ্কটের দিকে ঠেলে দেওয়া। তাই অবিলম্বে কোল ব্লক নিলামের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে দেখুক কেন্দ্রীয় সরকার, এই আর্জি রেখেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে এও বলেন, ‘সারাদেশের মোট কয়লা উৎপাদনের ৮০% পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি থেকে আসে। তাই কোল ইন্ডিয়ার সদর দপ্তর গঠিত হয়েছে কলকাতায়। এখন কোল ইন্ডিয়ার হেড অফিস ও রাজ্যে থাকা তার চার সহায়ক সংস্থা সাউথ ইস্টার্ন কোল ফিল্ড লিমিটেড (SECL), ভারত কোকিং কোল লিমিটেড (BCCL), সেন্ট্রাল কোল ফিল্ড লিমিটেড (CCL) ও মহানদী কোল ফিল্ড লিমিটেড (MCL) কে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে অন্য রাজ্যে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র।‘ এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করেছেন মমতা।

প্রধানমন্ত্রীকে তিনি জানান, এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের স্বার্থবিরোধী। একই সঙ্গে করোনা আবহে দেশ জুড়ে চলা লকডাউনের মধ্যে কীভাবে কোল ইন্ডিয়ার কর্মচারীরা অন্যত্র স্থানান্তরিত হবেন, সে নিয়েও সওয়াল তোলেন তিনি। এও জানান, এরফলে কোল ইন্ডিয়ার সঙ্গে যুক্ত শতাধিক কন্ট্রাকচুয়াল লেবার’রা কাজ হারাবেন। তাই দ্রুত এই সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

উল্লেখ্য, কোল ব্লকে বিদেশী বিনিয়োগের বিরোধিতা বা কোল ইন্ডিয়ার অফিস স্থানান্তর নিয়ে সরব হলেও, দীর্ঘদিন ধরে কার্যত ঝুলে থাকা দেউচা পাচামি কোল ব্লকের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি মুখ্যমন্ত্রী। কেন্দ্রের নিলাম প্রক্রিয়ায় দেউচা পাচামিও রয়েছে কিনা সেটা জানা যায়নি। আর তা হলে, বিরাট মুনাফা তথা জীবিকার দিশা হারাবে বাংলা। কোল ব্লকের নিলামের বিরুদ্ধে আগামী ২-৪ জুলাই কয়লা শিল্পে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে পাঁচটি কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনকে নিয়ে গঠিত ‘জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি’। সেই ধর্মঘটে যোগ না দেওয়ার কথা জানিয়েছে, তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন ‘কয়লা খাদান শ্রমিক কংগ্রেস’। মুখ্যমন্ত্রীর এই বিরুদ্ধ মনোভাবের ফলে তারাও ধর্মঘটে সামিল হবে কি কিনা সে নিয়েও কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, কেন এতটা দেরীতে সক্রিয় হলেন মুখ্যমন্ত্রী? কোল ইন্ডিয়ার অফিস স্থানান্তরের বিষয় কি রাজ্য সরকার জানত না? তবে শেষ মুহুর্তে এই সক্রিয়তা কি শুধু ‘বিরোধীতা’র জন্য বিরোধীতা? এমন বহু প্রশ্নই উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো মুখ্যমন্ত্রীর এই চিঠির সূত্র ধরে। মুখ্যমন্ত্রীর চিঠির জবাবে কি কেন্দ্র এখন কী বার্তা দেয়, সেটাই দেখার।