উত্তরে অস্ত্র উন্নয়ন, মমতার লক্ষ্য ৫৪-য় ৪০ নিশ্চিত করা

সোমনাথ চক্রবর্তী, কলকাতা : মেরুকরণের মোকাবিলায় হাতিয়ার উন্নয়ন। ভোট বড় বালাই। তাই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি তুচ্ছ করে উত্তরবঙ্গে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক বৈঠক তাঁর প্রধান কর্মসূচি। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বৈঠকে বর্তমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলির অগ্রগতি খতিয়ে দেখবেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রকল্পগুলি শেষ করানোই তাঁর প্রধান লক্ষ্য যাতে ভোটের প্রচারে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখানো যায়।

এই প্রকল্পগুলির মধ্যে আছে জলপাইগুড়িতে করলা নদীর ওপর স্টিলের ফ্রেমের সেতু। একটি ফরাসি সংস্থা সেতুটি নির্মাণের কাজ করছে। এছাড়া কোচবিহারের দিনহাটার কাছে আদাবাড়িতে সেতুর ওপর নজর আছে তাঁর। এই সেতুটি সেই বাম আমল থেকে নির্মিত হচ্ছে। এখনও কাজ শেষ না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। তাছাড়া একই জেলায় বলরামপুরে কালজানি নদীর ওপর সেতু এবং কোচবিহার থেকে রায়ডাক হেরিটেজ রোড সেতুটিও মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আছে। এই সেতু দুটির কাজ শেষের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী চান, ২০২১ মার্চের মধ্যে শেষ করতে। কোচবিহারে মেখলিগঞ্জ ও হলদিবাড়ির মধ্যে আরও একটি বড় সেতুর কাজ চলছে ১৫০০ কোটি টাকা খরচ করে।

- Advertisement -

কোচবিহার জেলা এখন তৃণমূল নেত্রীর অন্যতম মাথাব্যথার কারণ। গত লোকসভা নির্বাচনে এই জেলা হারিয়েছিল তৃণমূল। বর্তমান পরিস্থিতিও শাসকদলের অনুকূল নয়। সেজন্য কোচবিহারের উন্নয়ন মুখ্যমন্ত্রীর অন্যতম পাখির চোখ। একই কারণে তাঁর নজর থাকবে মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর ও পাহাড়ের দিকে। এই জেলাগুলিতেও বিজেপি সুবিধাজনক অবস্থায়। শুধু সংখ্যালঘু ভোটের ভরসায় এই জেলাগুলি হাতে আনা কঠিন বুঝে এবারের সফরে প্রশাসনিক বৈঠকে এই জেলাগুলির নির্দিষ্ট কিছু প্রকল্পের ওপর মুখ্যমন্ত্রী গুরুত্ব দেবেন বলে নবান্ন সূত্রে খবর। ওই সূত্রে জানা গিয়েছে, মালদার মানিকচকে গঙ্গার ওপর সেতু, উত্তর দিনাজপুরে চারটি সেতু নির্মাণ যাতে দ্রুত শেষ হয়, তা নিশ্চিত করতে চান মমতা।

উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, ইলেক্ট্রিক চুল্লি, আইটিআই, পলিটেকনিক, মেডিকেল কলেজ, খেলার মাঠ সংস্কার, পর্যটন কেন্দ্র, রাস্তা, কত কি না করা হয়েছে। তাই বিজেপিকে উত্তরবঙ্গের মানুষ প্রত্যাখ্যান করবেই। কার্সিয়াংয়ের ডাউহিলে চার কোটি টাকা খরচ করে সুবাস ঘিসিংয়ে স্মৃতি ভবন নির্মিত হয়েছে। চারতলা এই ভবনটি সফরের মধ্যে উদ্বোধন করবেন মুখ্যমন্ত্রী। আলিপুরদুয়ারের পানবাড়িতে জয়ন্তী নদীর ওপর নতুন সেতু তৈরির কাজকেও দ্রুততর করতে চান তিনি। উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের এক প্রভাবশালী নেতা বলেন, লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে ১৮টি আসনে বিজেপি জিতলেও কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের উন্নয়নে কিছুই করেনি। বিধানসভা ভোটে সেটাই প্রচার করা হবে। উন্নয়নেই মুখ্যমন্ত্রীর সবচেয়ে বেশি নজর।

জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট দেওয়া নিয়ে আগামী ১৮ তারিখ জেলা প্রশাসনের কর্তারা চূড়ান্ত বৈঠকে বসছেন। কোন কাজ অগ্রাধিকার দিয়ে করা হবে তা মুখ্যমন্ত্রীকে জানানোর ব্যাপারে সেখানেই ঠিক হবে। দার্জিলিং জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি রঞ্জন সরকার বলেন, মুখ্যমন্ত্রী দলীয়ভাবে বৈঠক করবেন কি না তা আমরা এখনও জানি না। যদি বৈঠকের নির্দেশ আসে তাহলে কিছু প্রস্তাব দেব।

তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরে প্রশাসনিক বৈঠকের পর তিনি উত্তরবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের রণকৌশল তৈরির কাজে হাত দেবেন। তাতে জেলাভিত্তিক উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরাতেই তিনি অগ্রাধিকার দেবেন। গত ১০ বছরে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে খরচের হিসাব থাকবে দলীয় প্রচারে। প্রশাসনিক বৈঠকে সেটা সুনিশ্চিত করা অন্যতম লক্ষ্য মমতার। পুলিশ সুপারদের কাছে জেনে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। পর্যটন দপ্তর, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর, পূর্ত, সেচ, পরিবহণ, বিদ্যুৎ, শ্রম দপ্তরের কাজকর্ম নিয়ে বিশদে আলোচনা হবে। বিশেষ করে চা বাগানের সমস্যা সমাধানের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের পাশাপাশি পাহাড়ের দুই জেলার কথা মাথায় রেখে চা বাগানেও উন্নয়নকে হাতিয়ার করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। চা বাগান নিয়ে কিছু ঘোষণাও তিনি করতে পারেন উত্তরবঙ্গ সফরে। তিনি সফরের মধ্যে কিছু বিশিষ্ট লোকের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানা গিয়েছে। কথা বলবেন ব্যবসায়ী সমিতিগুলির সঙ্গেও।