সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি : ইতিহাস ঘাটলেও পাওয়া যাবে না দিনাজপুরের রাজবংশী সমাজের মুখোশ নাচ বা মোখানাচের মুখোশ কে, কবে প্রথম তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, এই মুখোশ সমগ্র বিশ্বের সামনে তুলে নিয়ে এসেছেন দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমণ্ডির প্রত্যন্ত গ্রামের এক কৃষক পরেশ সরকার। আজ দেশ-বিদেশের বহু মানুষের বাড়িতে, সরকারি দপ্তরে দিনাজপুরের এই মুখোশ শোভা পেলেও জানেন না পরেশ সরকারের কথা। জানেন না, পরেশবাবু কীভাবে সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে নিয়ে এসেছিলেন এই মুখোশকে।

সাতসকালেই বলদ, হাল নিয়ে জমিতে চলে যেতেন পরেশ সরকার। বাড়ি কুশমণ্ডির পশ্চিম বলরামপুর গ্রামে। জমির শক্তমাটিতে আবাদ করতে করতে ভাবতেন পাশের গ্রাম বেলডাঙা রুয়ানগরের বাসিন্দা শংকর সরকারের কথা। যিনি ছিলেন জন্মগত হস্তশিল্পী। কাঠ কেটে কেটে নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত মুখোশ তৈরি করতেন শংকরবাবু। নিজে শিল্পী না হলেও শিল্পী মনোভাবসম্পন্ন পরেশবাবুর মাথায় ওঠে নানা চিন্তা। চিন্তায় আসে শংকরবাবুর তৈরি মুখোশ নিয়ে যদি একটা ওয়ার্কশপ তৈরি করা যায়। যদি সেই ওয়ার্কশপে শংকরবাবুর কাজ দেখে আরও ছেলেমেয়ে এগিয়ে আসে মুখোশ তৈরিতে। তবেই বাঁচানো যাবে এই মুখোশ শিল্পকে। কিন্তু ওয়ার্কশপ তৈরি করা তো আর সহজকথা নয়, দরকার জমি। জমির জন্য দরকার টাকা। তাঁর এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য কৃষিকাজ করার পাশাপাশি স্থানীয় একটি গ্রন্থাগারে কাজ শুরু করেন। সেই টাকা জমাতে শুরু করেন একটু একটু করে। কিছুটা টাকা জমলে মহিষবাথানে কিনে ফেলেন এক টুকরো জমি। সেই জমিতে বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি হয় ওয়ার্কশপ। সেখানেই শংকর সরকার দিনের পর দিন গড়ে তুলতেন নানা ধরনের মুখোশ। যে মুখোশ দেখে স্থানীয় ছেলেমেয়েরা শিখতে আসেন মুখোশ তৈরি। স্বপ্ন সফল হয় পরেশ সরকারের।

শংকরবাবু আজ বেঁচে নেই। তবে তাঁর শেখানো মুখোশ গড়ে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে দৌড়াচ্ছেন নবপ্রজন্মের শিল্পীরা। ৩০ বছর আগে পরেশ সরকারের দেখা স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হয়ে বেঁচে রয়েছে মহিষবাথানের মুখোশ। পরেশ সরকার নিজেও খুশি। তবে শংকর সরকারের মৃত্যু তাঁকে খানিকটা মর্মাহত করেছে। পরেশবাবু জানান, বছরের শুরুতে রাজবংশী সমাজে মুখোশ নাচ বা মোখানাচ হয়ে আসছে বহু যুগ ধরে। সেই মুখোশকে সুন্দরভাবে তৈরি করে বাজারে নিয়ে যেতে পারলে এলাকার বেকার ছেলেরা স্বাবলম্বী হতে পারবে এই ধারণা থেকেই মহিষবাথান হস্তশিল্প সমবায় সমিতির জন্ম। বর্তমানে ওই সমবায়ে শিল্পী সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। মহিষবাথানের সঙ্গে পাশের জেলা উত্তর দিনাজপুরের বহু শিল্পী কাজ করছেন। মুখোশ তৈরির কাজ শিখে নিজেরাই মুখোশ তৈরি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন এমন শিল্পীর সংখ্যা হাতে গোনা যাবে না। প্রয়াত শংকর সরকারের হাতে তৈরি প্রায় ৫০ জন হস্তশিল্পী বর্তমানে সারা দেশে মুখোশ শিল্পকে প্রথম সারিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। প্রথম দিনের বাতার ঘর আর নেই। বাম আমলে মন্ত্রী নারায়ণ বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছিলেন নীচতলার ওয়ার্কশপ। বর্তমান সরকার সেই ধারাকে টেনে তুলেছে কয়েকশো ধাপ ওপরে। মহিষবাথানের হস্তশিল্পীদের কাজ দেখে রাজ্যের তিন জেলার সঙ্গে মহিষবাথানকেও শিল্পতালুকের আওতায় এনে রাজ্য সরকার বিশ্বের সামনে যাওয়ার পথ খুলে দিয়েছে মহিষবাথানের মুখোশকে। তৈরি হয়েছে মিউজিয়াম সহ তিনতলার ভবন।

মহিষবাথানের তরুণ হস্তশিল্পী শংকর দাস ঘুরে এসেছেন লন্ডন, জার্মানি, প্যারিস। ভারত সরকারের জিআই নম্বর পেয়েছে মহিষবাথান। ইউনিসেফের প্রত্যক্ষ সাহায্য, লাগাতার প্রশিক্ষণ সব মিলিয়ে রাজ্য সহ সারা দেশে এখন মহিষবাথানের মুখোশ বাজার করে নিয়েছে। কাজ পাচ্ছেন হস্তশিল্পীরা। মহিষবাথান গ্রামের বৈশ্য সমাজ (৭০ পরিবার) আগে বাঁশ কেটে ঝাঁটা, কুলো, ডালি তৈরি করলেও এখন মহিষবাথানের প্রত্যক্ষ প্রভাবে তাঁরাও তৈরি করছেন মুখোশ। শীতের সময় দম ফেলবার সময় থাকে না কারও। সারা দেশের সমস্ত মেলায় যাচ্ছেন মুখোশ শিল্পীরা। মহিষবাথানেও মুখোশমেলায় আসছেন বাইরের দেশের বহু মানুষ। মেলা ঘুরে বছর শেষে মুখোশ শিল্পীদের আবার পরের বছরের জন্য আর চড়া সুদে ঋণ নিতে হয় না। নতুন নতুন সৃষ্টির সঙ্গে নিজেদের জীবন জীবিকার মান বদলে আধুনিক সমাজের কাছাকাছি আসার রূপকার যে পরেশ সরকার একথা বলতে কুণ্ঠা বোধ করেন না বর্তমানের হস্তশিল্পী শংকর দাস, সুষেন সরকার, সাঞ্জুলাল সরকার, গোপাল বৈশ্য, জগা বৈশ্য, ঊষা বৈশ্যরা।