রোজা ভেঙে রক্ত দিলেন কালিয়াচকের যুবক

তনয় মিশ্র, মোথাবাড়ি : লকডাউন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে করোনা ভীতিও। সচেতন মানুষরা নিজেরাই এড়িয়ে যেতে চাইছেন অন্য মানুষের সংস্পর্শ। হোক না তা পরিচিত কেউ। কোথাও কোথাও আবার পরিস্থিতি এমনই যে, নিজের আত্মীয়-প্রতিবেশীদেরও কাছাকাছি আসতে নারাজ তাঁরা। কিন্তু শুক্রবার সম্পূর্ণ আলাদা এক ছবি দেখা গেল মালদা শহরে। আতঙ্ক-সংকীর্ণতা কাটিয়ে ২০ কিমি বাইক চালিয়ে এসে এক প্রৌঢ়কে রক্ত দিলেন যুবক। আর সেখানে দেখা মিলল সম্প্রীতিরও। হিন্দু ওই প্রৌঢ় নিদান সাহাকে (৫৮) রক্ত দিতে রোজা ভাঙতেও পিছপা হননি নিসার আহমেদ। বরং কিডনির সমস্যায় ভুগতে থাকা মানুষটির রক্তের প্রয়োজনে মালদা মেডিকেলের ব্লাড ব্যাংকে এসে রক্তদান করে তাঁর প্রাণ বাঁচান ওই যুবক।

নিসার আহমেদের বাড়ি কালিয়াচক-২ ব্লকের রথবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের কাগমারি মোড় এলাকায়। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সেভ হিউম্যানিটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে জানতে পারি, মালদা শহরের বাঁশবাড়ি এলাকার এক রোগীর রক্তের প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় বিকল হয়ে গিয়েছে তাঁর দুটি কিডনিই। অত্যন্ত দ্রুত তাঁকে এ পজিটিভ রক্ত দিতে হবে। কিন্তু ব্লাড ব্যাংকে এ পজিটিভ রক্ত পায়নি তাঁর পরিবার। রোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, শহরের নেতা-নেত্রী থেকে শুরু করে বহু রক্তদাতা সংস্থার কাছে গেলেও রক্ত পাওয়া যায়নি। হঠাৎই নজরে আসে উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এ সদ্য প্রকাশিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ সেভ হিউম্যানিটির কথা। এরপরই পরিবারের তরফে যোগাযোগ করা হয় সেভ হিউম্যানিটি কর্ণধার রবিউল ইসলামের সঙ্গে। সেইমতো রবিউলবাবু তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এ পজিটিভ রক্তের আবেদন জানিয়ে পোস্ট করেন। কিন্তু গ্রুপের অধিকাংশ সদস্যই জানিয়ে দেন যে, লকডাউনের কারণে এই মুহূর্তে তাঁরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে রাজি নন। নিসারবাবু আরও জানান, অন্তত চার থেকে পাঁচজন রক্তদাতার এ পজিটিভ রক্ত থাকলেও ওই রোগীকে বাঁচানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসেননি। এমন অনেকেই ছিলেন, যাঁদের রোজা ছিল না। তাঁরা রক্ত দিতেই পারতেন। কিন্তু কেউই রক্ত দেননি। এরপরই আমি ঠিক করি যে আমিই রক্ত দেব।

- Advertisement -

রোজা ভাঙা নিয়ে যদিও কোনও আক্ষেপ নেই নিসারবাবুর। তিনি বলেন, আমার মতে মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই আসল জীবন। আমরা যখন সেভ হিউম্যানিটি তৈরি করেছিলাম, তখনই আমরা ঠিক করেছিলাম যে বছরে তিনবার করে রক্ত দেব। তাই করোনা আতঙ্কের জন্য কাউকে এগিয়ে যেতে না দেখে আমার মনে হল, রোজা পালনের থেকেও বড় ধর্ম মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এই বিপদের দিনে মানুষকে সাহায্য করার দায়িত্বও তো আমাদেরই। রোগীর এক আত্মীয় দেবরাজ সাহা জানান, এই মুহূর্তে চারিদিকে রক্তসংকট চলছে। কেউই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে রক্ত দিতে চাইছেন না। সেই পরিস্থিতিতেও নিসারবাবু যেভাবে এত দূর থেকে নিজের রোজা ভেঙে আমাদের জন্য এলেন, তাতে আমরা কৃতজ্ঞ। ওঁর ঋণ আমরা কোনওদিন পরিশোধ করতে পারব না।