চিনের মদতে ভারতের বহু এলাকা নেপালের ম্যাপে

3097
এই সেই বিতর্কিত ম্যাপ

শুভঙ্কর চক্রবর্তী ও শক্তিপ্রসাদ জোয়ারদার, শিলিগুড়ি ও কিশনগঞ্জ : সীমান্তে ভারত-চিন উত্তেজনার পরিবেশের মধ্যেই নেপালে ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে ভারতবিরোধী শক্তি। কিছুদিন আগে ভারতের একাধিক এলাকাকে নিজেদের দাবি করে তাদের পার্লামেন্টে একটি ম্যাপ প্রকাশ করেছিল সেদেশের সরকার, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে হইচই শুরু হয়েছিল। সম্প্রতি একটি ম্যাপ প্রকাশ করেছে গ্রেটার নেপাল ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (জিএনএনএফ) নামে নেপালের একটি সংগঠন। গ্রেটার নেপাল নামে সেই ম্যাপে সিকিম, দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, দুই দিনাজপুর ছাড়াও পাটনা, কাটিহার, পূর্ণিয়া সহ বিহারের প্রায় গোটা অংশ, সিমলা, উত্তর কাশী, দেরাদুনকেও নেপালের এলাকা হিসাবে দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের দিনাজপুর ও রংপুরকেও সেই ম্যাপে পাকিস্তান অধিকৃত নেপালের অংশ বলা হয়েছে।  ম্যাপ নিয়ে তদন্তে নেমে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের। তাঁরা জানতে পেরেছেন, গত এক বছরে চারবার চিনে গিয়ে বৈঠক করে এসেছেন জিএনএনএফ-এর চেয়ারম্যান ফণীন্দ্র নেপাল। এমনকি চিনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে তাঁর। ফলে গ্রেটার নেপালের নামে ম্যাপ প্রকাশের পিছনে চিনের মদত রয়েছে বলেই মনে করছেন গোয়েন্দারা। এসএসবির তরফেও ম্যাপ তৈরির উৎসের খোঁজে তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে জানানো হয়েছে।

কবে থেকে নেপালে জিএনএনএফ সক্রিয় হয়েছে, তা সঠিকভাবে এখনও জানা যায়নি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, সংগঠনটি নেপালে এনজিও হিসাবে নথিভুক্ত আছে। ভারতের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবকে চিঠি লিখে সংগঠনটি প্রচারের আলোয় আসে। ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল নেপালের সব থেকে বড় মিডিয়া গ্রুপ কান্তিপুরের একটি সাপ্তাহিক প্রকাশনায় ‘গ্রেটার নেপাল নিয়ে সবুজ সংকেত দিল চিন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সীতারাম বড়াল নামে এক সাংবাদিক সেই প্রতিবেদনে ফণীন্দ্রর চিন যাওয়ার কথা প্রকাশ্যে আনেন। সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বেজিংয়ে আমন্ত্রণেই ফণীন্দ্র সেদেশে গিয়েছিলেন। চিনের শীর্ষস্তরের কমপক্ষে ৫০ জন আধিকারিকের সঙ্গে গত এক বছরে ফণীন্দ্র বৈঠকে বসেছিলেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে। চিনে গিয়ে গ্রেটার নেপালের ম্যাপও বিভিন্ন দপ্তরে দিয়ে এসেছেন জিএনএনএফ চেয়ারম্যান।

- Advertisement -

প্রকাশিত ম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে, নেপালের বর্তমান আয়তন ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ১৮১ স্কোয়ার কিলোমিটার আর গ্রেটার নেপালের আয়তন ২ লক্ষ ৪ হাজার ৯১৭ স্কোয়ার কিলোমিটার। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, গ্রেটার নেপালের সমর্থনে দেশজুড়ে স্বাক্ষর অভিয়ান শুরু করেছে জিএনএনএফ। মিশন কালাপানি ও গ্রেটার নেপাল শিরোনামে নেপালি ও ইংরেজি ভাষায় দুটি হ্যান্ডবিলও বিলি করতে শুরু করেছে সংগঠনটি। সেই হ্যান্ডবিলে ১৮১৬ সালে ব্রিটিশদের সঙ্গে নেপালের রাজার একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করে সেই চুক্তিমতোই গ্রেটার নেপালের ম্যাপ তৈরি হয়েছে। গণস্বাক্ষর সহ দাবিপত্র নেপালের রাষ্ট্রপতি ছাড়াও সার্কের সমস্ত শীর্ষকর্তা এবং রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবের কাছে পাঠানো হবে বলে প্রচার চালানো হচ্ছে। সংগঠনের সদস্য হওয়ার জন্য একটি মোবাইল নম্বর ও ই-মেল আইডিতে আবেদন পাঠাতেও বলছে জিএনএনএফ। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, সংগঠন পরিচালনার জন্য চিনের আর্থিক সহযোগিতাও পাচ্ছে জিএনএনএফ। নেপালের অভ্যন্তরে কারা সংগঠনটিকে মদত দিচ্ছে, কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জিএনএনএফ যুক্ত রয়েছে কি না, সেগুলি খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দা সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, যেহেতু বাংলাদেশের একটা বড় অংশকে নেপালের এলাকা হিসাবে ম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে তাই বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিভাগও ওই বিষয়ে খোঁজখবর শুরু করেছে। ম্যাপ, হ্যান্ডবিল ছাড়াও জিএনএনএফ-এর বেশ কিছু সভার ভিডিও হাতে এসেছে গোয়েন্দাদের। সেইসব ভিডিওতে লাগাতার ভারতবিরোধী উসকানিমূলক প্রচার করা হচ্ছে। ভারতবিরোধী একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী নেপালে সক্রিয় রয়েছে বলে অনেক আগেই অভিযোগ উঠছিল। নেপাল থেকে ভারতে ঢোকার পথে বেশ কয়েকবার জঙ্গিরা ধরা পড়েছে। জিএনএনএফ-এর সঙ্গে ভারতবিরোধী কোন কোন জঙ্গিগোষ্ঠীর যোগাযোগ আছে, সেটাও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। যদিও বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি গোয়েন্দা কর্তারা। ভারত-নেপাল সীমান্তরক্ষার দায়িত্বে থাকা এসএসবি কর্তারাও স্পর্শকাতর বলে ম্যাপের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে কিছু বলতে রাজি হননি।