সীমান্তের গ্রামে রাতে বেরিয়ে ভোরে ঘরে ফেরে না অনেকেই

154

পার্থসারথি রায়, সিতাই : রাতে হঠাৎ কারও ডাক আসে। বাড়ির ছেলেটা বেরিয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। ভোরে ফিরে আসে যখন, তাদের কোঁচার খুঁট বা প্যান্টের পকেটে থাকে একতাড়া নোট। সেদিন সকালে আবার বাজার থেকে মাছ-চাল আসে। বেশ কয়েকদিন হাঁড়ি চাপে উনুনে। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতবিরেতে যেতে হয় ছেলেটাকে। বাড়িতে একরাশ উদ্বেগ নিয়ে জেগে থাকেন বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তান কোলে স্ত্রী।

কোচবিহার জেলার সিতাই, শীতলকুচি, গিতালদহ, বামনহাট, চৌধুরীহাটের মতো এলাকায় এইসব দৃশ্য অত্যন্ত পরিচিত ঘরে ঘরে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এই বিস্তীর্ণ এলাকার সীমান্ত দিয়ে প্রায় প্রতিদিন চোরাচালান চলে। গোরু থেকে লবণ, নানা নিত্যপ্রযোজনীয় পাচার হয়ে যায় রাতের অন্ধকারে।

- Advertisement -

সীমান্তের গ্রামে কান পাতলেই শোনা যায়, গোরু পাচারের মতো ভালো ব্যবসা নেই। একবার জংলা উর্দি পরা জওয়ানদের চোখ এড়িয়ে ওপারে পাঠাতে পারলেই মোটা টাকা এসে যায় হাতে। শীতের কুয়াশা পড়লে চোরাচালানকারীদের ব্যস্ততাও বাড়ে। সিতাইয়ের গ্রামে বিএসএফের গুলিতে তিনজনের মৃত্যুর পর এই গল্প আবার ঘুরেফিরে আসছে এলাকায়।

শীত পড়লে অবশ্যই মাথাব্যথা বাড়ে বিএসএফের। কখনো-কখনো ওপরতলা থেকে সতর্কবার্তা আসে জঙ্গি অনুপ্রবেশ বা অস্ত্র পাচারের। তখন নজরদারি আরও কড়া হয়। বিএসএফের নজরদারি কড়া হলে তার ফল যে কী হয়, সেটা ভারত বা বাংলাদেশ দুপারের সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দারাই জানেন। তবু হতদরিদ্র পরিবারগুলির জওয়ান ছেলে থেকে বয়স্করা কাঁচা টাকার টোপে জড়িয়ে পড়েন চোরাচালানের মতো অবৈধ কারবারে।

সীমান্ত গ্রামের কেউ কেউ বলেন, পাচারচক্রের মাথার সঙ্গে বিএসএফ-পুলিশের বোঝাপড়া থাকলে বিপদ কম। সবসময় যে বোঝাপড়া থাকে, এমনটাও নয়। আর তা না থাকলে কী হয় তার জ্বলন্ত উদাহরণ গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সিতাইয়ের পশ্চিম চামটার ঘটনা।

সাতভাণ্ডারী গ্রামে গুলিতে প্রকাশ বর্মনের মৃত্যু নিয়ে পুলিশ ও বিএসএফের বক্তব্য, প্রায় ৫০ জনের একটি দল গোরু পাচার করছিল। টহলদারি জওয়ানরা বাধা দেওয়ায় তারা হামলা করে। অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে জওয়ানরা গুলি চালান। তাতেই মৃত্যু হয়েছে পাচারকারীদের। পরিবারের দাবি, প্রকাশ দিনমজুরের কাজ করতেন। অন্যের জমিতে জন খাটতেন। কোনওভাবেই চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

কোচবিহারের সীমান্তবর্তী অন্যান্য এলাকার পাশাপাশি সিতাই ব্লকের চামটা গ্রাম পঞ্চায়েতের বরথর, সাতভাণ্ডারী, পশ্চিম চামটা, সিতাই-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের কাইতের বাড়ি, ধূমেরখাতা, ব্রহ্মোত্তরচাতরা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্দরান সিঙ্গিমারি সহ সিতাই-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ অংশ সীমান্তের কাঁটাতার ঘেঁষা। অতীতে ঠিক এভাবেই পরিবারের একমাত্র আশাভরসার মানুষটি চিরকালের জন্য হারিয়ে গিয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তাহলে কেন দুদেশের সীমান্তের বাসিন্দাদের একাংশ এই গোরু পাচারের কাজে যুক্ত হয়? সাতভাণ্ডারী গ্রামের একজন বাসিন্দা বলছিলেন, প্রত্যন্ত এই সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশই সচ্ছল নন। সংসারে অভাব-অনটনের চাপে জীবনের ঝুঁকি থাকলেও কিছু কাঁচা টাকার জন্য অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ সংসারে সচ্ছলতা থাকলেও দ্রুত ফুলেফেঁপে ওঠার হাতছানিতে একাজে যুক্ত হয়।

আরেক বাসিন্দা ব্যাখ্যা দিলেন, আসলে গোরু তো দূর থেকে গাড়িতে বা অন্য উপায়ে সীমান্তের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছায়। সেখান থেকে গোরুগুলিকে হাঁটিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কাজ করতে হয়। ঘণ্টাখানেকের এই কাজে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা হাতে চলে আসে। যাঁদের ঘরে রোজ হাঁড়ি চড়ে না, তাঁদের পক্ষে এই টাকার টোপ এড়ানো কঠিন।

গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরলেন সিতাইয়ের বিধায়ক জগদীশচন্দ্র বর্মাবসুনিয়া। তাঁর বক্তব্য, সীমান্ত দিয়ে গোরু পাচারকারী হিসেবে যাঁদের চিহ্নিত করা হচ্ছে, আদৌ তাঁরা তা নন। স্থানীয় কিছু সাধারণ মানুষ কাঁচা পয়সার লোভে গোরু এক বা একাধিক জায়গা থেকে সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন। তাঁদের স্থানীয় ভাষায় ডাঙ্গোয়াল বলা হয়। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কাঁটাতার পার করার কাজও করে থাকেন। কিন্তু মূল পাচারকারী তো এঁরা নন। আড়ালে থাকা মূল পাচারকারীদের দিকে তো কেউ হাত বাড়ায় না।

জগদীশবাবুর প্রশ্ন, ছোট কিংবা মাঝারি আকারের গোরু কাঁটাতার ডিঙিয়ে পার করা সম্ভব হলেও বড় গোরু সেভাবে পার করা অসম্ভব। তাহলে সেগুলি রাতের অন্ধকারে ওপারে যাচ্ছে কীভাবে? গুলি চালিয়ে হতদরিদ্র মানুষ মারার আগে এসব নিয়ে স্বচ্ছতা আসা অত্যন্ত জরুরি।

গ্রামের ভাঙা বেড়া দেওয়া টিনের ঘরের পরিবারগুলি এতকিছু বোঝে না। তারা জানে, রাতে ডাক এলে ঘরের তরতাজা ছেলেটা বাইরে যাবে। আর তারপর ভোরে ফিরবে কি না, সেটা কেউ জানে না।