ভোট নয়, এখন ভবিষ্যতের ভাবনা জোড়াইয়ে

74

চাঁদকুমার বড়াল, কোচবিহার : একসময় এই এলাকা ছিল কাঁচা টাকার স্বর্গরাজ্য। অসম-বাংলা সীমান্ত সংলগ্ন সেই জোড়াই মোড়ে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা। স্থানীয় সেলস ট্যাক্সের অফিসটিকে কেন্দ্র করেই ছিল এই জনপদের রমরমা। সেই অফিসকে কেন্দ্র করে ছিল বহু মানুষের আনাগোনা। গমগম করত এলাকা। তারপর জিএসটি চালু করল কেন্দ্র। উঠে গেল সেই সেলস ট্যাক্সের অফিস। আর তার সঙ্গে সঙ্গে যেন ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ হয়ে গেল জোড়াইয়ের সমস্ত জাঁকজমক। ভোটের মুখে এলাকার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে সকলের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল ভোটের চেয়ে তাদের বড় ভাবনা অন্নসংস্থান।

বাসিন্দারা বলছেন, গত কয়েক বছরে পালটে গিয়েছে এখানকার জনজীবন। বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে কাজ খুঁজতে চলে গিয়েছেন ভিনরাজ্যে। কেউ কেউ আবার ঘরেই বসে গিয়েছেন। এলাকার ঘরে, ঘরে বেকারত্ব। স্থানীদের কথায়, এখানকার উন্নতি ও অবনতি, সবকিছুর মূলেই রয়েছে ওই সেলস ট্যাক্সের অফিসটি। পুরোনো দিনের স্মৃতি আঁকড়ে এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে ফাঁকা, জনমানবহীন দপ্তরটি। ভোটের মুখে এই এলাকার ক্ষয়িষ্ণু আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ভাবাচ্ছে সকলকেই।

- Advertisement -

কোচবিহার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জোড়াই মোড়। পাশেই রয়েছে বক্সিরহাট এলাকা। অসম-বাংলা সীমান্তের এই জনপদে রয়েছে জোড়াই মোড় বাজার। আর রাস্তার পাশে ছিল সেলস ট্যাক্সের অফিস। এই অফিসকে ঘিরেই গত কয়েক দশক এই এলাকার যা কিছু উন্নয়ন। কিন্তু ২০১৬ সালে কেন্দ্র জিএসটি চালু করার পর ছবিটা বদলে যায়। সেলস ট্যাক্সের দপ্তর বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ হারিয়ে পথে বসলেন কয়ে হাজার মানুষ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাংলা থেকে অসম ঢোকার মুখে এবং অসম থেকে বাংলা যাওয়ার সময় সমস্ত পণ্যবাহী ট্রাক এখানে দাঁড়াত। জোড়াই মোড়ে থাকা সেলস ট্যাক্সের অফিসে তাদের চালান কাটতে হত। নির্দিষ্ট কর জমা দেওয়ার পর ট্রাক সীমান্ত পার করার অনুমতি মিলত। আর এর ফলে সারাদিন এখানে ভিড় ও যানজট লেগেই থাকত। আর এত মানুষের ভিড়ে ২৪ ঘণ্টাই এলাকায় বহু দোকানপাট খোলা থাকত। গভীর রাত অবধি খোলা থাকত বহু খাবারের দোকান। ব্যবসাও হত চুটিয়ে, সেইসঙ্গে ট্রাকগুলোর কাগজপত্র দপ্তরে নিয়ে গিয়ে সেখানে কর জমা দেওয়া, ক্লিয়ারিং বের করা ইত্যাদি কাজ করতেন প্রায় দুহাজার মানুষ। তাঁদের মধ্যে কমবয়সিদের সংখ্যাই ছিল বেশি। তাঁরা এই কাজের বিনিময়ে ট্রাকচালকদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক পেতেন। কিন্তু সেলস ট্যাক্সের দপ্তরটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে ট্রাকগুলিকে আর এখানে কোনও কর দিতে হয় না। তাই ভিড়ও হয় না। ব্যবসাও হয় না। অধিকাংশ দোকানই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যেগুলো রয়েছে, সেগুলিতেও আর আগের মতো ব্যবসা হয় না। যাঁরা ক্লিয়ারিংয়ের কাজ করতেন, তাঁরা কাজ হারিয়েছেন। সবমিলিয়ে গত পাঁচ বছরে বদলে গিয়েছে এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা।

স্থানীয় বাসিন্দা মনমোহন ঘোষ বলেন, আমার চায়ের দোকানে আগে সারাদিনে প্রায় তিন হাজার টাকার বিক্রি হত। এখন পাঁচশো টাকারও হয় না। আমার দুই ছেলে আগে ক্লিয়ারিংয়ে কাজ করত। অফিস উঠে যাওয়ার পর বেকার হয়ে যায়। এখন কেরলে কাজ করতে গিয়েছে। ক্লিয়ারিংয়ে কাজ করতেন স্থানীয় যুবক বটকৃষ্ণ রায়চৌধুরী। তিনি বলেন, আগে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হত। অফিস বন্ধ হওয়ার পর থেকে প্রায় বেকারই হয়ে গিয়েছি।  জোড়াই মোড় ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক প্রদীপকুমার ঘোষ বলেন, এখন আর ব্যবসা বলতে কিছুই নেই। এলাকার দোকনাপাটের বিক্রিবাটা তলানিতে এসে ঠেকেছে। ওই অফিস ছিল আমাদের লক্ষ্মী। তা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই আমাদের জীবনে অভিশাপ নেমে এসেছে।

জিএসটির হাত ধরে লক্ষ্মীবিদায় হয়েছে জোড়াই মোড় থেকে। এটাই এখন বাসিন্দাদের মনের কথা।