বন্যপ্রাণীর হানা বাড়ছে, কৃষি ছেড়ে অন্য আয়ের খোঁজ

279

রাঙ্গালিবাজনা ও কামাখ্যগুড়ি : আলিপুরদুয়ারের বিভিন্ন গ্রামে বন্যপ্রাণীর হানা কমছে না। বুনো হাতি ও বাঁদরের উৎপাতে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে চাষিদের আশঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে। হাতির হানার হাত থেকে ধান তো বটেই, বাদ যাচ্ছে না আলু, বিভিন্ন শাকসবজি, পাটও। এই পরিস্থিতিতে মাদারিহাট-বীরপাড়া ও ফালাকাটা ব্লকের বন লাগোয়া গ্রামের অনেক চাষি বিকল্প আয় খুঁজছেন। অনেকে কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন। কেউ আবার মাছ চাষ, হাঁস, মুরগি প্রতিপালন সহ ছোটখাটো ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। মাদারিহাটের ইসলামাবাদ, ছেকামারি, মধ্য খয়েরবাড়ি, উত্তর খয়েরবাড়ি, বীরপাড়ার বিরবিটি, দেবীশিমুল, বড় হাওদার মতো অনেক এলাকার বাসিন্দাই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজে নিয়েছেন।

দক্ষিণ খয়েরবাড়ির কথাই ধরা যাক। গ্রামের গা ঘেঁষে খয়েরবাড়ি বনাঞ্চল। হাতির হানায় অতিষ্ঠ হয়ে জমি ফেলে রেখে ভুটানে শ্রমিকের কাজ করতে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। লকডাউনে অবশ্য অনেকে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। ইসলামাবাদ গ্রামের হেদায়েতপুরের মকসেদুল হক, আমিনুল হক, মোক্তার আলি, রফিকুল হক সহ অনেকেই বিঘার পর বিঘা জমি চাষ না করে ফেলে রেখেছেন। উত্তর খয়েরবাড়ির বন লাগোয়া আদিবাসী মহল্লা লায়কাধুরার দীনেশ ওরাওঁ বলেন, চাষ করেও ফসল ঘরে তোলা যাচ্ছে না। উত্তর রাঙ্গালিবাজনার ডাঙ্গাপাড়ার বাসিন্দা হরিশংকর বর্মন বলেন, হাতির ভয়ে গ্রামে ভুট্টা চাষ পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রত্নাঝোরায় অসংখ্য জমিতে গবাদি প্রাণী চরে বেড়াচ্ছে।

- Advertisement -

বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে গিয়ে উত্তর হেদায়েতপুরের কৃষ্ণ ওরাওঁ ঘরের পিছনে চৌকো গর্ত খুঁড়ে তাতে হাইব্রিড মাগুর মাছের চাষ করছেন। বলোয়াধুরা নামে অপর আদিবাসী মহল্লার বাসিন্দা রঞ্জিত ওরাওঁ মাছ চাষ, উন্নতমানের হাঁস, মুরগি প্রতিপালন শুরু করেছেন। ফালাকাটা ব্লকের পূর্ব দেওগাঁওয়ের বাসিন্দা শামিম হোসেন বলেন, অনেকেই জমি পতিত রেখে দিনমজুরি করছেন। জলদাপাড়ার সহকারী বন্যপ্রাণ সংরক্ষক দেবদর্শন রায় এ বিষয়ে বলেন, হাতির হানায় ক্ষতি হচ্ছে, এটা ঠিক। তবে ক্ষতিপূরণও দেওয়া হচ্ছে। জলদাপাড়ায় ৭২টি যৌথ বন সুরক্ষা কমিটি রয়েছে। প্রতি বছর জলদাপাড়ার আয়ের চল্লিশ শতাংশ ওইসব কমিটির মাধ্যমে বনবস্তির ২৫ হাজার পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। টাকার অঙ্কটা দাঁড়ায় তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা।

অন্যদিকে, বাঁদরের উপদ্রব থেকে বাঁচতে পারিবারিক উদ্যোগে চা বাগান তৈরি করে লাভের মুখ দেখেছে কুমারগ্রাম ও আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকের বেশ কয়েকটি পরিবার। কামাখ্যাগুড়ি-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের দক্ষিণ নারারথলিতে আটিয়ামোচর ফরেস্ট লাগোয়া প্রায় ১২ বিঘা জমিতে সতীশ লাকড়ার পরিবার চা বাগান তৈরি করেছে। একই পরিবারের সদস্য হেলারুস কুজুর বলেন, বাঁদরের উৎপাতে লাউ, কুমড়ো, পটল, ঝিঙে থেকে শুরু করে যে কোনও ফসলই ঘরে তোলা দায়। বনকর্মীদের বহুবার বিষয়টি জানানো হয়েছে। কিন্তু লাভ হয়নি। কামাখ্যাগুড়ির বাসিন্দা দেবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে বাঁদর সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। লোকালয়ে খাবার মেলায় তারা আর বনে ফিরতে চায় না। আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকের দক্ষিণ রায়ডাক বনাঞ্চল সংলগ্ন মহাকালগুড়ি ও পারোকাটা গ্রাম পঞ্চায়েতেও এভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চা চাষ হচ্ছে। বন দপ্তরের আটিয়ামোচর বিট ও দক্ষিণ রায়ডাক রেঞ্জের আধিকারিকরা জানান, বাঁদরের দলের হানার খবর পেলেই বনকর্মীরা প্রাণীগুলিকে জঙ্গলে ফেরাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।