চাঁদার ভয়ে আসছেন না কৃষকরা, হাটবাজার ফাঁকা

476

আলিপুরদুয়ার : আলিপুরদুয়ার শহর সহ গোটা জেলাতেই প্রতি বছর একাধিক ক্লাবের বিরুদ্ধে চাঁদা আদায়ে জুলুমবাজির অভিযোগ উঠে। বিশেষ করে দুর্গাপুজোয় আলিপুরদুয়ার শহরের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদার জুলুম মাত্রাছাড়া হয়ে যায় বলে অভিযোগ। দুর্গাপুজো কয়েক দিন বাকি আছে। তাই  চাঁদার ভয়ে আশপাশের গ্রামগঞ্জের সাধারণ কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল শহরের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে আসছেন না। ফলে শহর আলিপুরদুয়ারের বেশ কয়েকটি বাজার প্রায় দিনই ফাঁকা থাকছে। বাজারে সবজি সহ অন্য জিনিসপত্র তেমন আমদানি না হওয়ায় হু হু করে দাম বাড়ছে। শুধু আলিপুরদুয়ার শহর নয়, ফালাকাটার হাটখোলা, শালকুমারহাট, দলদলির হাট, বারোবিশার সাপ্তাহিক হাট সহ গোটা জেলার হাটগুলিতেই একই অবস্থা।

সবজি ব্যবসায়ী উজ্জ্বল রায় বলেন,এমন পরিস্থিতি আর কয়েক দিন চললে হাটের ব্যবসায়ীদের পুজোর আগে লোকসানের মুখ দেখতে হবে। কাঁচামালের দামও বাড়বে। আলিপুরদুয়ার পুলিশ সুপার নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠি জানিয়েছেন, পুজো কমিটিগুলিকে নিয়ে বৈঠকের সময় পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যারা চাঁদা নিয়ে জুলুমবাজি করবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। হাট বাজারগুলিতে আমরা নজর রাখছি। চাঁদা নিয়ে অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

- Advertisement -

আলিপুরদুয়ার শহরের একটি অন্যতম বাজার ট্রান্সপোর্ট বাজার। এখানে সবজি, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে বিভিন্ন দোকান আছে। আশপাশের গ্রামের কৃষকরাও তাঁদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে এই বাজারে আসেন। রোজ ৩০০-রও বেশি ব্যবসায়ী এবং কয়েক হাজার ক্রেতা এই বাজারে কেনাবেচা করেন। বিশ্বকর্মা পুজোর দুই দিন আগে থেকেই বিশেষ করে গ্রামের কৃষকরা এই বাজারে আসা ছেড়ে দিয়েছেন। বাজারে দোকান  কমে দাঁড়িয়েছে  ১২০টিতে। এর মধ্যে বেশিরভাগ কৃষক তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে আনছেন না বলে জানাগেছে।

ট্রান্সপোর্ট বাজারে গিয়ে দেখা গেল বাজার প্রায় শুনশান। ৮০ টির মতো দোকান বসলেও সেগুলিতে তেমন সবজি নেই। আশপাশের কৃষকরাও আসেননি। বাজারের ব্যবসায়ী সুধাংশু বর্মন বলেন, ‘ক্লাবগুলি রসিদ কেটে দিয়ে গিয়েছে। মোটা চাঁদা চাইছে তারা। না দিলে দোকান করা মুশকিল হবে বলে হুমকি দিয়েছে। আমরা যারা সারা বছর দোকান দিই তারা চাঁদা দিতে বাধ্য। কিন্তু গ্রামের কৃষকদের তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। তাই এখন থেকেই তাঁরা আর বাজারে আসছেন না। কৃষকরা না আসায় বাজারে ভিড় কম হচ্ছে। ক্রেতারা বাজারে না আসায় আমাদেরও লোকসান হচ্ছে।

আলিপুরদুয়ার বড়বাজারের অবস্থাও একই। এই বাজারের কাপড় বিক্রেতা শ্যামল সাহা বলেন, আমাদের স্থায়ী  দোকান। তাই আমাদের চাঁদার পরিমাণ কিছুটা কম। কিন্তু যারা মাঝে মধ্যে এই বাজারে কাঁচামাল সহ অন্য জিনিসপত্র বিক্রি করতে আসেন তাদের মোটা চাঁদা দিতে হয়। বিশেষ করে চাঁদার কোপ পড়ে কৃষকদের উপর। তাই প্রায় ৭ দিন আগে থেকেই তাঁরা আর বাজার মুখো হচ্ছে না।এ র প্রভাব পড়ছে আমাদের উপর। কৃষকরা বাজারে না আসায় বাজার প্রায় প্রতিদিন শুনশান থাকছে। এর ফলে বাড়ছে সবজির দাম।

তপসিখাতা এলাকার কৃষক দীনবন্ধু রায় বলেন, জমিতে উৎপাদিত ফসল খুচরো বিক্রি করতে আগে আলিপুরদুয়ার শহরের বড়বাজারে নিয়ে যেতাম। কিন্তু দিন কয়েক থেকে ওই বাজার ও রাস্তায় চাঁদার জুলুম বেড়েছে । তাই এখন ঠিক করেছি দুর্গাপুজোর আগে আর সবজি নিয়ে বাজারমুখো হব না।

ফালাকাটার কৃষক অমর সিংহ বলেন, সামান্য আয় বেশি হয় বলে পাইকারি দরে ফসল বিক্রি না করে খুচরো বাজারে বিক্রি করে থাকি। কিন্তু এখন থেকেই বাজারে ও রাস্তায় চাঁদার যে অত্যাচার শুরু হয়েছে তাতে ব্যবসা বন্ধ রাখতে হবে। ভাবছি সব ফসল পাইকারের কাছেই বিক্রি করে দেবো।

আলিপুরদুয়ার টাউন ব্যবসায়ী সমিতি সম্পাদক প্রসেনজিৎ দে বলেন, শহরের ব্যবসায়ীদের লাগামছাড়া চাঁদার হাত থেকে বাঁচাতে তাদের ব্যবসায়ী সমিতির থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু শহরের বাজারগুলির ক্ষেত্রে এমন কোনো নিয়ম নেই। তাই তাঁদের চাঁদার ঝামেলা পোহাতে হয়। তবে চাঁদার বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে দেখলে কোনো ঝামেলা হবে না বলে মনে হয়।

ছবি-আলিপুরদুয়ার শহরের ট্রান্সপোর্ট বাজার।–আয়ুস্মান চক্রবর্তী

তথ্য- ভাস্কর শর্মা