শহিদ হওয়ার এক মাস পর শুধু চিতার ছবি এসেছিল

515

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা : সালটা ছিল ১৯৯২। টেলিগ্রামটা যেন  বজ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়েছিল ফালাকাটার পূর্ব ঝাড়বেলতলির বর্মনবাড়িতে। কাশ্মীরে জঙ্গিদের সঙ্গে লড়াইয়ে শহিদ হয়েছেন বাড়ির মেজ ছেলে রণঞ্জয় বর্মন ওরফে তাপস। ঘটনার আটদিন পর ১৬ এপ্রিল টেলিগ্রাম যখন বাড়িতে পৌঁছাল, ততদিনে চিতার আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছে রণঞ্জয়বাবুর নশ্বর দেহ। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে পাথর হয়ে যাওয়া মা রিনা বর্মনের চোখ দিয়ে একফোঁটাও জল পড়েনি। অব্যক্ত যন্ত্রণায তিনি মানসিক ভারসাম্য হারান। একমাস পর সেনাকর্মীরা বাড়িতে এসে রণঞ্জয়বাবুর জামাকাপড় আর শেষকৃত্যের একগুচ্ছ ছবি পৌঁছে দেন।

জানেন দাদা, আমার ভাই দেশের জন্য শহিদ হলেও এলাকাবাসীর অনেকের কাছেই ন্যূনতম মর্যাদাটুকু পাননি। আত্মীয়স্বজনরা এলেও কোনও নেতা বা জনপ্রতিনিধি আসেননি। এমনকি সেনাকর্মীরা ভাইয়ের জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার পর গ্রাম পঞ্চায়েতের তরফে একটা শংসাপত্র চেয়েছিলেন। সেটাও গ্রাম পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ দেয়নি। একনাগাড়ে কথাগুলি বলে একটু থামেন শহিদের দাদা মৃত্যুঞ্জয় বর্মন। তিনি বলেন, এখন তো দেহ বাড়িতে পৌঁছে দেওযা হয, শহিদের বাড়িতে কত সাধারণ মানুষ, নেতা, জনপ্রতিনিধি ভিড় করেন। অথচ আমাদের বাড়িতে নেতা, জনপ্রতিনিধিরা আসেননি।

- Advertisement -

একসময় দেওগাঁও গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার স্বনামধন্য সমাজসেবী ও জমিদার ছিলেন শুকচাঁদ বর্মন। স্কুল প্রতিষ্ঠার জমি থেকে সেচনালা খননের জন্যও বিঘার পর বিঘা জমি তিনি দান করেন। তাঁরই নাতির ছেলে রণঞ্জয়বাবু ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। রণঞ্জয়বাবু চাকরিতে যোগ দেওয়ায় ছেলের বিয়ে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকেন বাবা মোহনপ্রসাদ বর্মন। তবে তাঁর স্বপ্ন সফল হযনি। চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাত্র দুবছরের মাথায় ২৬ বছর বয়সি রণঞ্জয়বাবু শহিদ হন। এরপর আমৃত্যু ছেলের জ্বলন্ত চিতার ছবি আঁকড়ে ছিলেন মোহনপ্রসাদবাবু। ২০০৮ সালে তিনি প্রয়াত হন। মানসিক ভারসাম্য ফেরেনি রিনাদেবীর। তিনি গত বছর মারা যান।

রণঞ্জয়বাবুর তুতোভাই নীহারেন্দু বর্মন বলেন, আমরা সবাই মিলে দাদাকে ফালাকাটা স্টেশনে ট্রেনে তুলে দিতে গিয়েছিলাম। সেই যে চলে গেল দাদা, আর ফিরল না। আমরা ছবিগুলি রেখে দিয়েছি। রণঞ্জযবাবুর দাদা মৃত্যুঞ্জয়বাবু বলেন, যাঁদের বাড়ির সন্তান শহিদ হন, তাঁরাই বোঝেন যন্ত্রণা। একজন শহিদকে নিয়ে প্রথম প্রথম আলোচনা হলেও পরে কেউ খোঁজ রাখে না।