বীরভূমের ‘মেরি কম’ পারমিতা দত্তরায়

545

বীরভূম: এ এক অসম লড়াই এর কাহিনী। যার রচয়িতা সুদূর মনিপুরের বাসিন্দা তথা বিশ্বখ্যাত বক্সার মেরি কম। তিনি নিজেও হয়ত জানেন না তাঁর লড়াইকে আদর্শ করে আট মিটারের রিং এর ভেতরে ও বাইরে কঠিন যুদ্ধ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন আর এক অনন্যা। বিয়ের পর আজও বাংলার অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারে যেখানে স্বপ্ন দেখা বারন সেখানে অন্যকেও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বোলপুরের বাসিন্দা পারমিতা দত্তরায়। তাঁর লড়াইকে মেরি কমের সাথেই তুলনা করছেন বীরভূমের মানুষ।

ছোট থেকেই মার্শাল আর্ট শেখার ইচ্ছা থাকলেও রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য হওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। পাশ করে একাদশ শ্রেনীতে উঠতেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। কিন্তু অদম্য জেদ ও লড়াকু মানসিকতার জেরে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি। একপ্রকার লড়াই করে ছিনিয়ে আনেন ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী। এরপর ২০১৭ সালে কন্যা সন্তানের মা হন পারমিতা।

- Advertisement -

এরমধ্যেই মেরি কমের জীবনী নিয়ে পরিচালিত হিন্দী ছবি দেখে এই মহিলা বক্সারের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। তাঁর জীবনী পড়ে মেরি কমকে আদর্শ মেনে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে ক্যারাটে ক্লাশে ভর্তি হয়ে যান এই মহিলা যোদ্ধা। যদিও সবটাই শুরু হয়েছিল খুব গোপনে। বীরভূমের প্রখ্যাত ক্যারাটে প্রশিক্ষক কৌশভ সান্যালের কাছে গোপনে শুরু হয় তাঁর প্রশিক্ষণ। এরপর একজন সফল ক্যারাটেকা হিসাবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে। আসানসোলে অনুষ্ঠিত একটি রাজ্য স্তরের প্রতিযোগীতায় প্রথম রিং এর ভেতর পা রেখে দুটো ব্রোঞ্জ পদক ছিনিয়ে আনেন তিনি। এরপর আরও দুটো জেলা ও রাজ্য স্তরের প্রতিযোগীতা থেকে গোল্ড ও সিলভার পদক পায় পারমিতা।

তিনি বলেন, ক্যারাটে শেখার বিষয় জানাজানি হতেই বিভিন্ন দিক থেকে আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ শুরু হয়। বলা হয় ছেড়ে দিতে হবে ক্যারাটে। তবে ততদিনে আট মিটারের রিং এর ভেতরের লড়াইএ দক্ষ হয়ে উঠেছেন তিনি। তাই যাবতীয় বাধাকে ক্যারাটের কিকে ধরাশায়ী করে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। পারমিতা বলেন, আমাদের সমাজ শিক্ষিত হলেও প্রকৃত শিক্ষা থেকে আমরা অনেক দূরে অবস্থান করছি। তাই আজো নারীকে তার অধিকারের জন্য লড়াই করতে হয়। বিয়ের পর ক্যারাটে শিখি এটা জানতে পেরে অনেকেই শ্লেষ ভরা দৃষ্টিতে তাকাতো। কটূ কথা বলতেও ছাড়েনি অনেকেই। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের উপদেশ ছিল বিয়ের পর মেয়েদের এসব করতে নেই। এদের কথা আমায় গভীর ভাবে আঘাত করলেও ভেঙে পড়িনি। নিজেকে আরো শক্ত করে এগিয়ে গেছি। পারমিতা জানান কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও নিয়ম করে ইনডোর প্র‍্যাকটিস চালিয়ে গেছেন তিনি। ২০২১ এ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে সকল বাধার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন তিনি। বর্তমানে ব্লু বেল্টের অধিকারী এই মহিলা যোদ্ধার বক্তব্য, বেল্ট নয় আমার লক্ষ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে স্বর্ণ পদক নিয়ে আসা।

পারমিতার ক্যারাটে প্রশিক্ষক কৌশভ সান্যাল বলেন, অবিশ্বাস্য ইচ্ছাশক্তির অধিকারী পারমিতা। আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলে সফল হওয়াই বর্তমানে ওর একমাত্র লক্ষ্য। আশা করি ও সফল হবে। পারমিতার এই অসম লড়াইকে কুর্নিশ করছেন বীরভূম জেলার মানুষ। তাঁর সাথে তুলনা করা হচ্ছে মেরি কমের লড়াইকে। একরত্তি মেয়েকে সামলেও যে খেলার ময়দানে নেমে সফল হওয়া যায় তা প্রমাণ করছেন বীরভূমীর এই বাসিন্দা। পারমিতার ইচ্ছা বিবাহিত মেয়েদের খেলাধূলার প্রতি উৎসাহিত করে তোলা। তাঁর সফলতার খতিয়ান দেখে ইতিমধ্যেই তাঁর কাছে ক্যারাটে শেখার জন্য যোগাযোগ করছেন বোলপুরের অন্যান্য গৃহবধূরা।

বোলপুর বিবেকানন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই ছাত্রীর সফলতায় গর্বিত তৎকালীন গেম টিচার বিশ্বজিত মন্ডল। তিনি বলেন, আমি গর্বিত। ওর সাফল্য কামনা করছি। আশা করি পারমিতা তার লক্ষ্যে সফল হবেই। প্রাক্তন এই ছাত্রীকে স্কুলের তরফে সংবর্ধনা দেওয়ার বিষয়ে তিনি প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলবেন বলে জানান।