পরিবেশ রক্ষায় ছোট্ট মেঘের অভিনব উদ্যোগ নজর কাড়ছে

208

দীপংকর মিত্র, রায়গঞ্জ : কতই বা বযস হবে। বড়োজোর ১২ বা ১৩ বছর। পড়াশোনা করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এই বয়সেই সে সামাজিক দায়বদ্ধতার নজির সৃষ্টি করেছে। প্লাস্টিকমুক্ত পরিবেশ গড়তে অব্যবহৃত জামাকাপড় দিয়ে ব্যাগ বানিয়ে ফেলেছে। শুধু পরিবারের সকলকে নয়, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও মেঘ দত্ত এই ব্যাগ বিতরণ করেছে। এমনকি সকলে যাতে এই ধরনের ব্যাগ ব্যবহার করেন, তার জন্য রায়গঞ্জ শহরে নিজস্ব উদ্যোগে প্রচারও চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জেলার পরিবেশবিদরা।

রায়গঞ্জ শহরের দত্তপাড়ার বাসিন্দা শুভাশিস দত্ত একজন ফোটোগ্রাফার। তাঁর স্ত্রী শম্পা দত্ত গুপ্ত প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। এই দম্পতির দুই ছেলে। বড়ো ছেলে রোদ্দুর দত্ত দশম শ্রেণির ছাত্র। ছোটো ছেলে মেঘ পড়াশোনা করে রাযগঞ্জ সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের ক্লাস সিক্সে। প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ যে পরিবেশের পক্ষে খুবই ক্ষতিকারক তা বুঝতে পেরেছে ছোট্ট মেঘ। আর এই কারণেই অব্যবহৃত জামাকাপড় দিয়ে তৈরি করেছে হাতব্যাগ। সে জানায়, প্লাস্টিকের জন্য জল সংকট তৈরি হচ্ছে। ড্রেনে পড়ে সেগুলি আবর্জনা আটকে দিচ্ছে। ড্রেন দিয়ে জল যাওয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নদী-নালায় সেগুলি ফেলে দেওয়ায় প্রাণীরা খাবার হিসাবে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে, মারা যাচ্ছে। ক্যারিব্যাগ মাটির সঙ্গে মিশে যায় না বলে দূষণ ছড়ায চারিদিকে। তাই আমাদের সকলের উচিত প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের পরিবর্তে কাপড়ের ব্যাগ বেশি করে ব্যবহার করা। এই কাজটায় যদি আমরা সাফল্য পাই, তাহলে আগামীদিনে রায়গঞ্জ শহরকে সুন্দর করে তুলতে পারব।

মেঘ জানায়, বাড়িতে পুরোপুরি প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করার পর স্কুলের বন্ধুদেরও প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের পরিবর্তে কাপড়ের তৈরি ব্যাগ ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করেছি। আমার কথামতো তারাও তাদের বাবা-মাকে একটি করে পুরোনো টি শার্টের কাপড়ের তৈরি ব্যাগ দেয়। ফলে প্লাস্টিকের ব্যবহার অনেক কমে গিয়েছে। আমরা যদি ২০টি বিদ্যালয়ে এইভাবে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করার কর্মসূচি গ্রহণ করি, তাহলে প্রতি মাসে ৬০ লক্ষ ক্যারিব্যাগ ব্যবহার বন্ধ হবে। প্রতি মাসে ৬০ লক্ষ ক্যারিব্যাগের ব্যবহার বন্ধ করলে অবশ্যই দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে উঠবে।

মেঘ ইতিমধ্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধের জন্য বিদ্যালয়ের বন্ধুদের হাতে নিজস্ব মেথড তুলে দিয়েছে। মেথডে বলা হয়েছে, প্রতিদিন বাজারে যাওয়ার আগে বাবা-মায়ের হাতে কাপড় বা চটের ব্যাগ তুলে দিতে হবে। কাপড়ের ব্যাগ পুরোনো টি শার্ট দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। সেইসঙ্গে তরল জাতীয় জিনিসের জন্য কনটেনার এবং খাবার সামগ্রীর জন্য এমন কনটেনার ব্যবহার করতে হবে, যা পুনরায় ব্যবহার করা যায়। আমার বিশ্বাস, এই মেথড মেনে চললে আগামীদিনে আমরা একটি দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়বই। আগামী ২ অক্টোবরের আগেই আমি ছাত্রছাত্রীদের হাতে মেথডটি তুলে দিতে চাই। কারণ আগামী ২ তারিখ নো প্লাস্টিক ডে।

মেঘের মা শম্পা দত্তগুপ্ত বলেন, আমার দুই ছেলের মধ্যে ছোটো ছেলে সব  বিষয়ে জানতে চায়। কয়েকদিন আগে একটি বিদ্যালয়ের কয়েকটি মেয়ে আমাদের বাড়িতে পাম্প থেকে ঠিকমতো জল ওঠে কিনা সেবিষয়ে সার্ভে করতে আসে। কয়েকটি বাড়িতে নাকি পাম্প থেকে জল উঠছে না বলে তারা জানায়। পাশেই একটি বাড়িতে মাটি খুঁড়তে গিয়ে দেখা যায় স্তরে স্তরে প্রচুর প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ। ওকে নিয়ে গিয়ে দেখাই এবং বুঝিয়ে বলি প্লাস্টিকের জন্য  মাটির ওপরের জল যেমন নীচে যাচ্ছে না, তেমনই নীচের জল সহজে ওপরে উঠছে না। সেসময় মেঘ আমায় বলে, ক্যারিব্যাগের ব্যবহার কমাতে হবে। আমরাই প্রথম শুরু করি। সে নিজের পুরোনো টি শার্ট দিয়ে ব্যাগ তৈরি করে। বাজার যাওয়ার আগে প্রতিদিন ব্যাগগুলি মেঘ তার বাবার কাছে এবং আমাকে দিয়ে দেয়। আমরা ক্যারিব্যাগের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছি।

শম্পাদেবী বলেন, ফলের দোকান বা মিষ্টির দোকানে ক্যারিব্যাগে ফল বা মিষ্টি দিতে নিষেধ করে দিই। এমনকি দোকানে গিয়ে বলি, কেউ যেন প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ব্যবহার না করেন। মেঘের মতো যদি আরও অনেকেই এভাবে এগিয়ে আসে তাহলে দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে উঠবেই। ছেলের এই অভিনব উদ্যোগে খুশি শম্পাদেবী। রায়গঞ্জের পরিবেশপ্রেমী সংগঠনের সদস্যরা ছোট্ট মেঘের এই অভিনব প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। কৌশিক ভট্টাচার্য, শংকর ধর, চন্দ্রনারায়ণ সাহা, গৌতম তান্ত্রিয়া সহ আরও অনেকে বলেন, আগামীদিনে প্লাস্টিকমুক্ত শহর গড়তে মেঘকে আমরা পাশে পাব এবং সে আমাদের মুখ হবে।