উত্তরবঙ্গে জাতীয় সড়ক উন্নয়নে নজর কম সাংসদদের

1423

রহিত বসু

উত্তরবঙ্গের বিজেপি নেতাদের এখন নতুন একটা কাজ হয়েছে। তাঁদের হাতে অফুরন্ত সময়। তাই জল্পনাতেই অনেক সময় কাটিয়ে দেওয়া য়ায়। এখনকার জল্পনার বিষয় হল, দিল্লিতে রদবদল হলে কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়তে পারে? জয়ন্ত রায়, নিশীথ প্রামাণিক, নাকি জন বারলা? দলের অন্দরে এখন এই নিয়ে জল্পনা চলছে। অনেকে তো এক ধাপ এগিয়ে এমন চর্চাও করছেন, কে দিলীপ ঘোষের অনুগামী,  কে মুকুল রায়ে সঙ্গে রয়েছেন?  আচ্ছা, বলুন তো, এসবে মানুষের কী আসে যায়! মন্ত্রী হলেই বা কী, আর এমপি হলেই বা কী! এই তো উত্তরবঙ্গের মানুষ গত লোকসভা নির্বাচনে দুহাত তুলে বিজেপিকে আশীর্বাদ করেছেন। ভালো কথা। গণতন্ত্রে মানুষের রায়কে মর্যাদা দিতেই হবে। কিন্তু মানুষ কী পেয়েছেন? এখানে তো একজন মন্ত্রীও আছেন। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবেন, মানুষের জীবনে কি আদৌ স্বর্গ নেমে এসেছে? আরে বাবা, শুধু তৃণমূলের কেউ চাল চুরি করেছেন কি না, ১০০ দিনের কাজের টাকা পকেটে ভরেছেন কি না, কোন মুখার্জি অথবা কোন পান্ডে বিজেপির দিকে পা বাড়িয়ে রয়েছেন, শুধু এসব দেখলে চলবে? এসবে কি মানুষের পেট ভরে?

- Advertisement -

অন্য সব কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, উত্তরবঙ্গে জাতীয় সড়কের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। রাস্তার চেহারা দেখলেই বুঝবেন, এক্ষেত্রেও উত্তরবঙ্গ কতটা বঞ্চিত। আমার শুধু জানতে ইচ্ছে করে, উত্তরবঙ্গের সাংসদরা শেষ কবে সড়কপথে উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গে গিয়েছেন। গেলে তাঁরা দেখতেন, উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গগামী জাতীয় সড়কের কেমন হাল। আপনার যদি ছোটবেলার কথা মনে থাকে, তাহলে খেয়াল করে দেখবেন, রকেট বাসে কলকাতা থেকে শিলিগুড়িতে পৌঁছোতে বড়জোর ১২ ঘণ্টা লাগত। আর এখন একই রাস্তা দিয়ে গাড়িতেই অনেক বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। বাগডোগরা থেকে ইসলামপুরের মধ্যে, বিশেষত ঘোষপুকুরের কাছে রাস্তার হাল খুব খারাপ। এখানে লম্বা অংশজুড়ে ফোর লেন থাকলেও তা ভাঙতে শুরু করেছে। অথচ এই ফোর লেন রাস্তা কিন্তু নতুন। ইসলামপুর থেকে ডালখোলা পর্যন্ত যে অংশ বিহারের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, সেই রাস্তার অবস্থা বরং তুলনামূলকভাবে ভালো। আবার ডালখোলা থেকে রায়গঞ্জ পর্যন্ত ফোর লেনের হাল দেখুন! কান্না পাবে। এখন তো কাজ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। রায়গঞ্জ থেকে মালদা পর্যন্ত ফোর লেনের কাজ হয়েছে বটে, কিন্তু কিছু জায়গায় ভাঙতেও শুরু করেছে। বেশিরভাগ জায়গায় দুটি লেনজুড়ে ধান ও ভুট্টা শুকোয়। আবার মালদা থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত যদি যান, তাহলে দেখবেন, সুজাপুরের পর রাস্তার হাল সব থেকে খারাপ। অনেক জায়গায় তো যা আছে তাকে রাস্তাই বলা যাবে না। তার সঙ্গে রয়েছে রাস্তার দুপাশে লরির লাইন। তার মাঝখান দিয়ে যেমন খুশি তেমন চলো। অনেক জায়গায় রাস্তায় বাজার বসে যায়। ফরাক্কা থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার রাস্তা বরং তুলনায় ভালো। পুরোটাই ফোর লেন। রাস্তার অবস্থাও তুলনায় ভালো। কিন্তু কৃষ্ণনগর থেকে বারাসত পর্যন্ত দু-লেনের রাস্তা যথারীতি ভাঙাচোরা। আবার মজা দেখুন, যেখানে যেখানে ফোর লেন হয়েছে, সেগুলো সবই টোল রোড। টোল নেওয়া হচ্ছে, অথচ রাস্তা সারাই করা হয় না। অথচ দক্ষিণবঙ্গের সবকটি টোল রোড- দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে বা বম্বে রোডের অবস্থা খুবই ভালো।

এখন কথা হল, জাতীয় সড়ক দেখভালের দাযিত্ব তো কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থার। তাহলে এমপিরা কেন চাপ সৃষ্টি করতে পারেন না? তাহলে তো এমন কথা আর বলা যাবে না যে, রাজ্য সরকারই শুধু উত্তরবঙ্গের প্রতি বঞ্চনা করে। এখন থেকে তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের নামও বলতে হবে। উত্তরবঙ্গের সাংসদরা যদি একসঙ্গে দিল্লি গিয়ে সড়ক পরিবহণ মন্ত্রকের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন, তাহলে বুঝব উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে তাঁদের আন্তরিকতা রয়েছে। না হলে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে য়দি উত্তরবঙ্গে জাতীয় সড়কের হাল ইশ্যু হয়ে ওঠে তাহলে বিজেপিকে বিপদে পড়তে হবে। কারণ, এখানে রাজ্য সড়কের অবস্থা তুলনায় ভালো। কেন্দ্রীয় শাসকদলের অস্বস্তি বাড়িয়ে এনএইচএআই-এর প্রোজেক্ট ডিরেক্টর (১) দীনেশ হংসরিয়া বলেছেন, ‘রাস্তার অবস্থা সত্যি খারাপ। সারাই করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু লকডাউন শুরু হয়ে যায়। সামনেই বর্ষা, তার মধ্যে বৃষ্টিও হচ্ছে।’ তবুও আমরা চেষ্টা করছি জাতীয় সড়ককে চলাচলের যোগ্য করে তুলতে। উত্তরবঙ্গ জোনের আরেক প্রোজেক্ট ডিরেক্টর প্রদ্যুৎ দাশগুপ্তের কথা হল, ‘জলপাইগুড়ি ও উত্তর দিনাজপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় দাবির জন্য প্রত্যাশিত হারে কাজের অগ্রগতি হয়নি। যেখানে কাজ করা সম্ভব হয়নি, সেখানে রাস্তা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে।’ তিনি বলছেন, ‘ময়নাগুড়ি ও ধূপগুড়ির মাঝামাঝি জায়গায় স্থানীয় দাবির জেরে কাজ করা যায়নি।’ এরপর তিনি বলেছেন, লকডাউনজনিত সমস্যার কথা এবং স্বীকার করেছেন, মহাসড়কের কিছু অংশ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তারপর বলেছেন, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তাঁরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।

শুনতে তো ভালোই লাগে। একেবারে নেতাদের মতো প্রতিশ্রুতি।