মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের স্মৃতি আজও নাড়া দেয় হিলিবাসীকে

412

বিধান ঘোষ, হিলি : মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেন বীর জওয়ানরা। শহিদ হন প্রায় চারশোরও বেশি ভারতীয় সেনা। যুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী স্থল ছিল হিলি। যুদ্ধের ৪৯ বছর পরেও আজও সেই ঘটনার স্মৃতি প্রবীণ হিলিবাসীর চোখে আজও জ্বলজ্বল করে উঠে। শহিদ সেনাদের স্মৃতিতে ২০০২ সালে গড়ে তোলা হয় শহিদ বেদি। এরপর প্রতি বছর ১২ ডিসেম্বর শহিদ সেনাদের স্মৃতিতে বেদিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানান ভারতীয় সেনার ১০০ রেজিমেন্ট। পাশাপাশি জেলা সৈনিক বোর্ডের তরফে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে স্মরণ করা হয়। কিন্তু এলাকাবাসীর দাবি, শহিদ ভারতীয়দের স্মৃতি রক্ষায় প্রশাসন আরও কিছু উদ্যোগ নিক।

পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিলির যুদ্ধ বা বগুড়া যুদ্ধ হয়। হিলির এই যুদ্ধস্থলে ২০ দিন ধরে যুদ্ধ চলে। পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় ভারতে অতর্কিতে হামলা চালায় পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। সেই সময় ভারতের তরফে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতীয় বাহিনী যৌথভাবে মুক্তিফৌজ গঠন করে। তারপরে শুরু হয় ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ অভিযান। হিলি রেল স্টেশনের পাশে একটি বাংকার করে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে ভারতীয় সেনারা। কিন্তু ১২ ডিসেম্বর সেই বাংকারে অতর্কিতে হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনা। ঘটনাস্থলে দুই বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে শহিদ হন ভারতীয় সেনার ১০ জন অফিসার সহ প্রায় ৪০০ জন বীর সেনানী। হিলি রমানাথ বিদ্যালয়ের মাঠে শহিদ সেনাদের সম্মান জানিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। হিলির বেশ কিছু জায়গায় এখনও শেল, মর্টারের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ভারতীয় বায়ুসেনা যুদ্ধের আসরে নামে। তৎকালীন সুখোই-৭, মিগ-২১ নিয়ে ভারতীয় বায়ুসেনার জওয়ানরা যুদ্ধ চালিয়ে যান। ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনারা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে দিয়েছে। তখনও হিলিতে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন পাক সেনার ২০৫ মাউনন্টেইন বিগ্রেডিয়ার তাজাম্মুল হোসেন মালিক। তাজাম্মুলের নেতৃত্বে পাকবাহিনী হিলি রেললাইন বরাবর তিনদিক  থেকে ব্যারিকেড করে বাংকারের মধ্য দিয়ে লড়াই জারি রাখে এই এলাকায়। ভারতীয় মাউনন্টেইন ডিভিশনের মেজর জেনারেল লছমন সিং লাহেলের রণকৌশলে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে ভারতীয় বাহিনী উন্মুক্ত পিছন থেকে আক্রমণ শুরু করে। মুক্তিবাহিনীর আচমকা আক্রমণের শিকার হন তাজাম্মুল। তাঁকে ইন্ডিয়ান আর্মি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।  মেজর জেনারেল নাজের শাহ ১৮ ডিসেম্বর নাটোর থেকে এসে তাঁকে মুক্ত করে নিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনার অন্যতম সেনানী ছিলেন ভারতীয় মাউনন্টেইন ডিভিশনের মেজর জেনারেল লছমন সিং লাহেল। তার রণকৌশলে পাকবাহিনীর রক্তপিপাসু কুখ্যাত বিগ্রেডিয়ার তাজাম্মুল হোসেন মাকিল পরাস্ত হয়েছিল। যুদ্ধজয়ের স্মারক হিসেবে বালুরঘাটে পাকিস্তানি ট্যাংক উপহার দিয়েছিলেন লাহেল। ভারত সরকার তাঁকে সম্মান জানিয়ে দিল্লিতে একটি রাস্তা নির্মাণ করেছেন। ২০০২ সালে তৎকালীন হিলি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নিতাই বসাকের উদোগে হিলি রমানাথ বিদ্যালয়ে মাঠে শহিদ সেনাদের সম্মান জানিয়ে শহিদ বেদি গড়ে তোলা হয়। এরপর থেকে শহিদ বেদি প্রাঙ্গণে ১২ ডিসেম্বর দিনটি শহিদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানো হয়। তবে শহিদ বেদি ছাড়া কিছুই করা হয়নি বলে হিলিবাসীর কাছে আক্ষেপ রয়ে গিয়েছে।

- Advertisement -

এপ্রসঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক তথা শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন,  হিলিতে যুদ্ধ শুরুর প্রাক-মুহূর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রথমে ত্রিমোহিনী বিকটকালীর মাঠে ঘাঁটি গড়ে তোলে। স্থানীয়দের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে শুরু করে সেনা। হিলি রেললাইনের পাশে বাংকার গড়ে তুলে যুদ্ধ শুরু করে ভারতীয় সেনা। পাকবাহিনীর শেল, মটার, গোলাবর্ষণ দিয়ে এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পালটা জবাব দিতে থাকে ভারতীয় সেনা। কাতারে কাতারে সেনা  পৌঁছে হিলি এলাকার বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ভারতীয় বায়ুসেনার চারটি যুদ্ধবিমান হিলির আকাশে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। চারিদিক থেকে ঘিরে পিছন থেকে ভারতীয় সেনা আক্রমণ করে যুদ্ধে জয়লাভ করে। দিনগুলি মনে পড়লে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। শহিদ সেনাদের আত্মত্যাগে এই জয় এসেছিল।