দাদন মেটাতে ফের ভিনরাজ্যের পথে সুলতানারা

349

মনোজ বর্মন,  শীতলকুচি : এলাকায় কাজ নেই, উপার্জন বন্ধ। সংসার চালাতে শীতলকুচি ব্লকের কয়েক হাজার পরিযায়ী শ্রমিক মালিকপক্ষের কাছ থেকে দাদন নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে দাদন শুধু নিলেই তো হবে না, অগ্রিম নেওয়া ওই টাকা তো তাঁদের শোধও করতে হবে। তাই উত্তরবঙ্গ থেকে বর্ষা বিদায় নিলেই দাদনের টাকা পরিশোধ করতে পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবার নিয়ে বিহার, অসমের মতো রাজ্যগুলিতে যেতে হবে। ওই জায়গাগুলিতে সাত-আট মাস কাজ করে তাঁরা যে টাকা রোজগার করবেন তাতেই কোনওমতে দাদনের টাকা মেটানো যাবে। তারপর হাতে সামান্য যে টাকা পড়ে থাকবে তাকে সম্বল করেই তাঁদের বাড়ি ফিরতে হবে। এলাকায় ১০০ দিনের কাজের ব্যবস্থা থাকলে তাঁদের এভাবে বিপাকে পড়তে হত না বলে শ্রমিকদের দাবি। এ বিষয়ে সরকারের ভূমিকায় প্রশ্ন উঠেছে।

বিজেপির শীতলকুচি মণ্ডল সভাপতি কনকচন্দ্র বর্মন বলেন, ভিনরাজ্যের ইটভাটাগুলিতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে শীতলকুচি ব্লক থেকেই সবচেয়ে বেশি মানুষ যান। এই ব্লকে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা হলে এত বেশি মানুষকে ভিনরাজ্যের ইটভাটায় শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে যেতে হত না। করোনা পরিস্থিতির জেরে বর্তমানে পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারে অভাব-অনটন বেড়েছে। তাই মালিকপক্ষের কাছ থেকে তাঁরা দাদন নিচ্ছেন। শীতলকুচির বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেসের হিতেন বর্মন বলেন, বর্ষায় ১০০ দিনের কাজ সম্ভব নয়। গোটা বছর ধরেও এই কাজ সম্ভব নয়। তাছাড়া এ কাজ করলে যে টাকা মেলে তার থেকে ভিনরাজ্যে মজুরির টাকা বেশি। এ কারণেই অনেকে বাইরে কাজ করতে যান। তবে রাজ্য সরকারের তরফে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। শ্রমিকরা ওই ঋণ নিয়ে এলাকায় ব্যবসা করতে পারেন।

- Advertisement -

শীতলকুচি ব্লকের কয়েক হাজার বাসিন্দা ইটভাটায় কাজ করেন। পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ছোটদেরও কাজে নিয়ে যান। সেখানে ছোটদেরও ইটভাটার কাজ করানো হয় বলে অভিযোগ। এভাবে ছোটরা ইটভাটার কাজে যুক্ত হয়ে পড়ায় তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকে। এলাকার বাসিন্দাদের জন্য কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার কোনও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেনি বলে অভিযোগ। এলাকায় ১০০ দিনের কাজ নিশ্চিত করতে পারলেই অনেককে পেটের টানে ভিনরাজ্যে ছুটতে হত না বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। এছাড়া কতজন শ্রমিক হিসাবে বাইরে কাজ করতে যাচ্ছেন সে বিষয়ে প্রশাসনের কাছে কোনও স্পষ্ট ধারণাও থাকে না বলে অভিযোগ। কাজের জন্য কতজন শ্রমিককে বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা জানতে প্রশাসন বেশ কয়েকবার ঠিকাদারদের চিঠি দিলেও তাঁরা কোনওদিন ঠিকমতো চিঠির উত্তর দেননি বলে অভিযোগ। তাঁরা নিজেদের মতো করেই শ্রমিকদের বাইরে কাজে নিয়ে যান। শ্রমিক হিসাবে কাজের জন্য শীতলকুচি ব্লকের মধ্যে গোলেনাওহাটি,  লালবাজার ও খলিসামারি, গোঁসাইয়েহাট, ছোট শালবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বাইরে যান।

শ্রমিক সুলতানা বেওয়া বলেন, এলাকায় কোনও কাজ নেই। তাই ভিনরাজ্যের ইটভাটায় শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে যাই। অভাব-অনটনের জন্য বাধ্য হয়ে দাদন নিয়েছি। দাদনের টাকাতেই বর্তমানে দুবেলা দুমুঠো খাচ্ছি। দাদনের টাকা মেটাতে বর্ষা ফুরোলেই ভিনরাজ্যের ইটভাটায় কাজে যাব। শ্রমিক সুভাষ বর্মন বলেন, প্রশাসন আমাদের দিকে কোনও নজরই দেয় না। পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে আমাদের কোনও সচিত্র পরিচয়পত্র নেই। তাই আমরা কোনও সরকারি সুযোগসুবিধা পাই না। সরকার আমাদের জন্য এলাকায় ১০০ দিনের কাজ নিশ্চিত করতে পারলে কাজের জন্য আমাদের ভিনরাজ্যে যেতে হত না। এক ঠিকাদার বলেন, অন্যান্যবার শ্রমিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাদন দিতে হয়। এ বছর আর্থিক সংকটে পড়ায় শ্রমিকরা নিজেরাই আমাদের কাছে এসে দাদন নিয়ে যাচ্ছেন।