কাজে ফিরতে বিমানই ভরসা পরিযায়ী শ্রমিকদের

330

ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি :  বহু চেষ্টা করেও কাজ জোটেনি নিজভূমিতে। তাই কেউ বালুরঘাট, কেউ আবার চোপড়া থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে পাড়ি দিয়েছিলেন কাজের খোঁজে। কেউ কাজ জুটিয়েছেন মুম্বইয়ে, কেউ আবার দিল্লি কিংবা বেঙ্গালুরুতে। প্রায় ১০-১২ বছর ধরে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। লকডাউনের গেরোয় সবকিছু যেন এবার লন্ডভন্ড হয়ে যায়। মালিক বেতন দিয়ে কাজে রাখতে না চাওয়ায় বাধ্য হয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াতে হয় চোপড়ার মেহতাব কিংবা বালুরঘাটের রিন্টু বর্মনদের। বেশ কয়েকমাস বাড়িতে কাটিয়ে তাই যানবাহন চলাচল একটু স্বাভাবিক হতেই বিমানে চেপে ফের কাজের ঠিকানায় যাত্রা শুরু উত্তরবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের।

তবে লকডাউনের সময় কাজের ঠিকানা থেকে যখন বাড়ির পথে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন ওই পরিযায়ী শ্রমিকরা, কষ্ট সেখানেও তাঁদের পিছু ছাড়েনি। মুম্বইয়ে পোশাক সেলাইয়ের কাজ করেন যুবক নিয়াদ মহম্মদ। তাঁর কথায়, লকডাউন শুরু হওয়ার কিছুদিন পর মালিক জানিয়ে দেন, তাঁদের পক্ষে আর শ্রমিকদের কাজে রাখা সম্ভব নয়। তাই তাঁরা যেন নিজেদের বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু আমরা যখন ফেরার সিদ্ধান্ত নিই, তখন যান চলাচল প্রায় বন্ধ। ট্রেন-বাস কিছুই চলাচল করছে না। তাই বাধ্য হয়ে একদিন একটি ট্রাকে করে আমরা কয়েকজন কিশনগঞ্জ পর্যন্ত আসি। এরপর সেখান থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার হেঁটে গভীর রাতে যেদিন বাড়ি ফিরি সেদিন আর শরীরে কিছু ছিল না। মেহতাবের কথায়, যেদিন চোপড়ায় বাড়িতে ফিরি, শরীর আর চলছিল না। এতদূর রাস্তা হেঁটে পা প্রায় ক্ষতবিক্ষত। পায়ের চটিটা ছিঁড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ পথ খালি পায়ে হাঁটতে হয়েছে। পা দিয়ে রক্ত ঝরলেও কিছু করার ছিল না। গোটা পথ শুনসান। লকডাউন চলছিল। যেভাবেই হোক বাড়ি পৌঁছানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য। বাড়ি ফিরেও যে শান্তি ছিল তা নয়। এলাকায় যেতেই পাড়া-প্রতিবেশীরা আপত্তি জানান। কারণ মুম্বইয়ে তখন প্রচুর মানুষ করোনায় সংক্রামিত। তাই আমরা করোনা পরীক্ষা করিয়ে নিই ও রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। বালুরঘাটের রিন্টু বর্মন, কালিপদ কাছোয়া, দিলীপ টিগ্গারাও মুম্বইতে মেয়েদের পোশাক সেলাইয়ের কাজ করেন। বাগডোগরা বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা গেল তাঁরাও এসেছেন মুম্বইয়ে বিমান ধরতে। তাঁদের কথায়, এত মাস কাজহারা হয়ে রয়েছি। বাড়িতে সংসার যে কীভাবে চলেছে তা একমাত্র আমরাই জানি। স্থানীয় এলাকায় কেউ সবজি বিক্রি করেছি, কেউ আবার ফল। কিন্তু মুম্বইয়ে কাজে যোগ দিতে পারলে আমাদের আর সমস্যা হবে না। তাই সেখান থেকে আমাদের যেতে বলার কারণেই আমরা যাচ্ছি। তবে বিমানের খরচ? প্রশ্ন রাখতেই দিলীপ, সহিদরা বলেন, আমাদের মালিক বলেছেন, টিকিট কেটে চলে আসতে। ওখানে গেলে ভাড়া দিয়ে দেবেন।

- Advertisement -

এদিকে, এদিন বাগডোগরা বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা গেল, কারও বিমান ছাড়বে  বেলা  ১২টায়, আবার কারও বিমান বিকেল ৪টায়। কেউ যাবেন সরাসরি মুম্বই, কেউ কেউ আবার কলকাতা হয়ে মুম্বই যাবেন। কিন্তু প্রায় সবাই বাগডোগরা বিমানবন্দরে চলে এসেছেন ভোর থাকতেই। দীর্ঘ পথ আসার ফলে অনেকে বিমানবন্দরে ঢুকেই মাথার নীচে ব্যাগ রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ চালাচ্ছেন গল্পগুজব। পরিযায়ী এই শ্রমিকদের অনেকেরই চোখেমুখে তখন উত্তেজনা। অজানাকে জানার আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। কারণ এদের অনেকেরই এবার প্রথম বিমানে চড়া। স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনায় রাতে ঠিকভাবে ঘুমাতে পর্যন্ত পারেননি নিয়াদ, মেহতাবরা। নিয়াদ বলেন, আমি কোনওদিন বিমানে চড়িনি। এবারই প্রথম চড়ব। তাই একটু উত্তেজনা তো থাকবেই। একই কথা মেহতাবেরও। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলে ট্রেনেই যেতাম। কিন্তু কবে তা স্বাভাবিক হবে জানি না। তবে কাজে তো যোগ দিতে হবে। তাই বিমানেই যাচ্ছি। বালুরঘাটের দিলীপ, কালিপদ থেকে শুরু করে চোপড়ার নিয়াদরা জানান, এখানে কাজ থাকলে তো আর এত কষ্ট করতে হত না। কিন্তু কাজ পাইনি বলেই পরিবার ছেড়ে ছুটতে হচ্ছে ভিনরাজ্যে। তবে এতসবের মধ্যেও তাঁদের আশঙ্কা, আবার লকডাউন হবে না তো?