লকডাউনে ওপার বাংলায় আটকে ঠাকুমা, মন খারাপ নাতিদের

215

কালিয়াগঞ্জ : চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ভাইয়ে সঙ্গে দেখা করতে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন বছর আটান্নর রাধারানি রায়। কালিয়াগঞ্জের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শেঠ কলোনির বাসিন্দা তিনি। কিন্তু তারপরই বিশ্বজুড়ে থাবা বসায় করোনা। তার জেরে মার্চ মাস থেকে ভারতে শুরু হয়ে যায় কড়া লকডাউন। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে দেশের প্রতিটি বর্ডার বন্ধ হয়ে যায়। আর এখনও পর্যন্ত সমস্ত বর্ডার না খোলায় নিজের বাড়ি ফিরতে পারেননি রাধারানিদেবী। বাধ্য হয়ে তিনি এখনও বাংলাদেশের দেউর গ্রামে ভাইয়ে বাড়িতেই আটকে রয়েছেন।

পেশায় ওষুধের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রাধারানিদেবীর ছেলে রঞ্জিত রায়। তিনি বলেন, ‘কালিয়াগঞ্জ থেকে রাধিকাপুর বর্ডার পার করে মা বাংলাদেশে মামাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কিন্তু লকডাউনের জন্য তিনি ওখানেই আটকে যান। এখনও তিনি সেখানেই আটকে রয়েছেন। এমনিতে দুমাসের মেয়াদ নিয়ে বাংলাদেশ গিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে মাস ছয়েক পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মাকে বাড়িতে ফেরানোর কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। এদিকে মায়ের মনও এখন নাতিদের দেখার জন্য ছটফট করছে। আমার দুই ছেলে রামানন্দ এবং রূপকও অনেকদিন ঠাকুমাকে দেখতে না পেয়ে সবসময় মনমরা হয়ে থাকছে। কয়েকবার রাধিকাপুর বর্ডারের চেকপোস্টে গেলেও কবে বর্ডার খুলবে, তার কোনও সদুত্তর পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মা অনেকদিন থেকে হৃদরোগে ভুগছেন। ফোন করলে কান্নাকাটি করছেন। তাঁর মুখে শুধু একটাই কথা, আমাকে যেভাবে পারিস দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যা। নাতিদের ছাড়া আমি বাঁচব না। অথচ আমার আর্থিক সামর্থ্য খুব বেশি নয়। তাই আমি বিশেষ কিছু করতেও পারছি না। এককথায়, চিন্তায় দিশেহারা হয়ে গিয়েছি আমরা। বাড়ির বাচ্চাগুলোও ঠাকুমার জন্য রাত-দিন কাঁদে। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করে না। এই সময়ে যদি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার কোনওভাবে আমার মাকে দেশে ফেরাতে সাহায্য করত, তাহলে আমি খুবই উপকৃত হই।’

- Advertisement -

রাধারানিদেবীর নাতি ক্লাস নাইনের ছাত্র রামানন্দ বলে, ‘আমি আর আমার ভাই দুজনেই রাতে ঠাকুমার কাছে শুই। রাতে ঘুমোনোর আগে ঠাকুমা আমাদের দুই ভাইকে বিভিন্ন গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াত। ঠাকুমা দুপুরে খাওয়ার সময় আমাদের দুই ভাইকেও ভাত মেখে খাইয়ে দিত। সেসব এখন আর কিছুই হচ্ছে না। আমাদের কোনও কিছু খাওয়ার ইচ্ছে হলে ঠাকুমার কাছে বায়না করতাম। বাবা-মাকে লুকিয়ে আমাদের পয়সা দিত ঠাকুমা।’

দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র রূপক রায় রাধারানিদেবীর ছোট নাতি। যদিও সে এখনও বোঝে না কেন বাড়িতে ঠাকুমা নেই। রঞ্জিতবাবু বলেন, ‘ও এখন দুপুরে এবং রাতে শোবার সময়ে ঠাকুমার রেখে যাওয়া শাড়ি নিয়ে ঘুমোতে যায়। জিজ্ঞাসা করলে শুধু বলে, এর মধ্যে ঠাকুমার গায়ে গন্ধ রয়েছে।’

রাধিকাপুর চেকপোস্ট সূত্রে খবর, তাদের কাছে এই বিষয়ে এখনও কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও নির্দেশ আসেনি। তাই কবে বর্ডার খুলবে অথবা বিদেশে যাওয়া মানুষদের দেশ ফেরত নেবে এই বিষয়ে কোনও কিছু বলতে পারছে না। যদি খুব দরকার থাকে তবে ফরেন রেজিষ্ট্রেশন অফিসে থেকে বিশেষ অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে বলে খবর। এছাড়া কলকাতা এম্ব্যাসিতে যোগাযোগ করলে তারা এই বিষয়ে সহযোগিতা করছে। এছাড়া যেসব চেকপোস্টে স্ক্রিনিংয়ে ব্যবস্থা আছে সেখান দিয়ে আসারও অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে বোঝা যাচ্ছে যে, এই বিষয়টি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভর করছে।

উত্তর দিনাজপুরের বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী বলেন, এই মুহূর্তে দেশে-বিদেশে অনেক মানুষ আটকে পড়েছেন। বিদেশে আটকে থাকা মানুষদের বন্দেভারতের মাধ্যমে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তাই উনি যদি আমাকে এই বিষয়ে চিঠি দেন তাহলে অবশ্যই আমি ঊর্ধ্বতন কর্তপক্ষের কাছে বিষয়টি জানাব।

তথ্য : অনির্বাণ চক্রবর্তী