পঞ্চানন্দপুরে ভিড় জমাচ্ছে শীতের অতিথিরা

কল্লোল মজুমদার, মালদা : শীত পড়তেই ওরা আসতে শুরু করেছে গঙ্গার চরে। ওরা মানে সরাল, পিইং হাঁস, বড়দিঘর, কুশিয়াচাহা, বড়গুলিন্দা, কাস্তেচরারা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ডানায় ভর করে ওরা শীতে এসে পৌঁছায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। বাদ থাকে না মালদা জেলাও। শীতের অতিথিরা ইতিমধ্যে এসে পৌঁছে গিয়েছে পঞ্চানন্দপুরের গঙ্গাচরে। তবে এত তাড়াতাড়ি এই পরিযায়ী পাখিদের ভিড় কিছুটা হলেও অবাক করেছে পাখিপ্রেমীদের। অবাক করেছে বিশেষজ্ঞদেরও।

প্রতি বছর বর্ষায় পূর্ণগর্ভা হয়ে ওঠে মালদা জেলার প্রধান নদী গঙ্গা। আবার বর্ষা শেষ হতেই জল নেমে যায় দ্রুতগতিতে। গঙ্গাবক্ষে গজিয়ে ওঠে একের পর এক চর। জল কমে গেলে নদীগর্ভ মাছের ভাণ্ডারে পরিণত হয়। অল্প জলে মাছ ধরতে সুবিধা হওয়ায় পরিযায়ী পাখির দল এসে ভিড় জমায় এই চরগুলিতে। যে পাখির ছবি তুলতে, যে পাখি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন পাখিপ্রেমীরা। তবে পরিযায়ী পাখি শিকার করার ঘটনাও ওঠে আসছে প্রতিনিয়ত। গত শীতেও এমনই একাধিক ঘটনা বনদপ্তরের নজরে নিয়ে এসেছেন পাখিপ্রেমীরা। পাখিপ্রেমীদের দাবি, এই এলাকাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা হোক। তাতে এলাকার মাঝিমল্লারদের কর্মসংস্থান যেমন হবে, তেমনই গড়ে উঠবে পর্যটন শিল্প। গত কয়েক বছর ধরে এই দাবি উঠে আসলেও হেলদোল নেই প্রশাসনের।

- Advertisement -

সম্প্রতি মালদা শহর থেকে একদল পাখিপ্রেমী পঞ্চানন্দপুরের গঙ্গাবক্ষে পাখির ছবি তুলতে যান। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই যে বিপুল পরিমাণে এবং নানা প্রজাতির পাখি এসেছে তা দেখে অবাক হয়ে যান পাখিপ্রেমীরা। তাপস কুণ্ডু নামে এক পাখিপ্রেমী জানান, আমরা গত দশ বছর ধরে এই এলাকায় পাখি পর্যবেক্ষণ করতে আসি। এই সময় কিছু টিট্টিভ প্রজাতির পাখির দেখা মিললেও এবারই প্রথম এমন কিছু পাখি দেখা গিয়েছে যাতে আমরা অবাক হয়ে গিয়েছি। এই পাখিগুলির মধ্যে কুশিয়াচাহা, মহা গাঙচিল, পাটকিলেশির গাঙচিল, বড়দিঘর আমাদের অবাক করেছে। আমরা খবর নিয়ে দেখেছি জলপাইগুড়ির গজলডোবা পাখির স্বর্গরাজ্য হলেও এখনও পর্যন্ত এই পাখিগুলি সেখানে এসে পৌঁছায়নি। আমাদের অনুমান, পরিযায়ী পাখির কাছে পঞ্চানন্দপুরের গঙ্গাচর ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাই প্রতি বছর গঙ্গার চরে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

শান্তনু সরকার নামে অপর এক পাখিপ্রেমী বলেন, ফরাক্কা থেকে পঞ্চানন্দপুর হয়ে মানিকচক পর্যন্ত গঙ্গাবক্ষকে কিছুদিন আগে ইম্পটেন্ট বার্ড এরিয়া হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। মূলত রাশিয়া, এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে পরিযায়ী পাখিরা ডিসেম্বর মাস থেকে এই এলাকায় আস্তানা গাড়ে। কিন্তু এবছর আমরা দেখছি নভেম্বর মাসের শুরুতেই পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। আমাদের অনুমান, পঞ্চানন্দপুরের পরিবেশ পরিযায়ী পাখিদের জন্য ক্রমেই আদর্শ হয়ে উঠছে। এই এলাকা ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুললে এলাকার বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিশোর বণিক নামের অপর এক পাখি বিশেষজ্ঞ বলেন, এই এলাকার মাঝিমল্লারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। বনদপ্তর ও প্রশাসনের উচিত এলাকাটিকে যাতে রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে তুলে নিয়ে আসা যায়, সেই ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগী হওয়া।

সুদীপ্ত মানি নামের অপর এক পাখিপ্রেমী বলেন, প্রতি বছর এই এলাকায় দেশ-বিদেশ থেকে পরিযায়ী পাখির দল এসে ভিড় জমায়। কিন্তু দুঃখের হলেও বাস্তব এই পাখিদের শিকার করা হচ্ছে মাংসের লোভে। যে মাংস বাজারে বিক্রি হয় অত্যন্ত চড়াদামে। আমরা বিষয়টি একাধিকবার বনদপ্তরের নজরে নিয়ে আসলেও তেমন কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। আমরা এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এলাকার মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগী হতে হবে বনদপ্তরকে। আমরা আমাদের সংগঠনের পক্ষেও এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছি। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ না হলে পাখি শিকার বন্ধ করা যাবে না।