কল্লোল মজুমদার, মালদা : শীত পড়তেই পরিযায়ী পাখিরা ভিড় করেছে পঞ্চানন্দপুরের গঙ্গার চরে। ইতিমধ্যে যে পরিমাণ পাখি ভিড় জমিয়েছে, তাতে আশ্চর্য হয়ে পড়েছেন পাখিপ্রেমীরা। তাদের দাবি, মালদার পঞ্চানন্দপুর গঙ্গাবক্ষ জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবাকে হার মানাতে প্রস্তুত। শুধু দরকার সরকারি উদ্যোগ। ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় পঞ্চানন্দপুরের পাখির ছবি দেখে ভিনজেলার পাখিপ্রেমীরাও আসতে শুরু করেছেন। মালদা জেলার কালিয়াচক-২ ব্লকের পঞ্চানন্দপুর এলাকায় রয়েছে বিস্তীর্ণ গঙ্গা। বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের কথায়, এই এলাকাটিকে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে অর্থাৎ ইম্পটেন্ট বার্ড এরিয়া হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি বছর গঙ্গার জল বেড়ে যাওয়ায় এলাকাটি পুরোপুরি ডুবে যায়। বর্ষার পর ফের গঙ্গাবক্ষে জেগে ওঠে একের পর এক নতুন চর। যে চর শান্ত এবং প্রাকৃতিকভাবে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। গঙ্গাগর্ভের মাছ, শামুক সহ অন্য জলজ কীট পরিযায়ী পাখিদের বিশাল খাদ্যভাণ্ডার। মূলত, বিপুল পরিমাণে খাদ্যসামগ্রীর জন্যই এই এলাকার গঙ্গাবক্ষকে নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে বেছে নিয়েছে পরিযায়ী পাখিরা।

রবিবার মালদা ও কলকাতা থেকে আসা একদল পাখিপ্রেমী পঞ্চানন্দপুর এলাকায় পাখি পরিদর্শন এবং পাখির ছবি তুলতে যান। এই দলেরই এক সদস্য তাপস কুণ্ডু জানান, ইতিমধ্যে পঞ্চানন্দপুরে দেশের অন্য রাজ্য তো বটেই, বিদেশ থেকেও পাখিরা আসতে শুরু করেছে। রাশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে পরিযায়ী পাখিরা ভিড় জমিয়েছে পঞ্চানন্দপুর চরে। আমরা আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি এই এলাকার পাখির সংখ্যা ও প্রজাতির সংখ্যা দেখে। যতদিন যাচ্ছে, ততই এই এলাকার গঙ্গাবক্ষ পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হচ্ছে। এই এলাকাটি দেশের যে কোনো আইবিএর কাছে ঈর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তবে এই এলাকাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য দরকার সরকারি উদ্যোগ। যেভাবে গজলডোবাকে কেন্দ্র করে ইকো-টুরিজম গড়ে তোলা হয়েছে, সেইভাবেই এই এলাকাটিকেও গড়ে তোলা যায়। তাতে যেমন পর্যটকদের আকর্ষণ করা যাবে, তেমনই এই এলাকার মানুষের আয়ের পথ সুগম হবে।

আর এক পাখিপ্রেমী শঙ্খ অধিকারী জানান, রবিবার আমরা দল বেধে পঞ্চানন্দপুরে নৌকা করে পরিযায়ী পাখি দেখতে গিয়েছিলাম। শুধু আমরা নয়, আরও একটি দল গিয়েছিল পাখি দেখতে। ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পেয়েছি এই এলাকায় এসে গিয়েছে প্রায় ৩০-৩৫টি বার-হেডেড গুজ। এই পাখিটি তিব্বত থেকে এভারেস্ট পার হয়ে প্রতি শীতে ভারতবর্ষে আসে। শীতের শেষে আবার চলে যায় নিজের দেশে। পাখিপ্রেমীদের কাছে বার-হেডেড গুজ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ, এই পাখিটি পৃথিবীর সবচাইতে উঁচু দিয়ে উড়তে পারে। সহ্য করতে পারে মাইনাস ৬৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা। এছাড়াও আমরা এদিন দেখতে পেয়েছি একটি পেরিগ্রিন ফ্যালকনকে। এটি একটি শিকারি পাখি। পৃথিবীর দ্রুততম শিকারি পাখি। উড়তে পারে প্রতি ঘণ্টায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার। গতকাল আমরা আরও দেখতে পেয়েছি কমন-শেলডাক, রুডি-শেলডাক, ইন্ডিয়ান স্পট-বেলিড ডাক, রেড-ক্রেস্টেড পচার্ডের মতো পরিযায়ী হাঁসদের। আবার গঙ্গাবক্ষে আশ্রয় নিয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে ব্ল্যাক-হেডেড গাল, ব্রাউন-হেডেড গাল, পাল্লাস-গাল। ইতিমধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে পাখিপ্রেমীরা এখানে আসার জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এলাকায় পাখিকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার কোনও সঠিক পরিকাঠামো নেই। সরকারি উদ্যোগে সেই পরিকাঠামো গড়ে উঠলেই পঞ্চানন্দপুর ঘিরে গড়ে উঠতে পারে এক আদর্শ ইকো-টুরিজম। য়েরকম গড়ে উঠেছে জলপাইগুড়ির গজলডোবা কিংবা ওডিশার মংলাজোরিতে।