কালিন্দ্রীপাড়ে তাঁবু খাটিয়ে কোয়ারান্টিনে শ্রমিকরা

কল্লোল মজুমদার, মালদা : অভাবের সংসার। দুমুঠো ভাতের জন্য ওঁরা ভিনরাজ্যে গিয়েছিলেন দিনমজুরের কাজে। আচমকা দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হয়ে যায়। কোনওরকমে ওঁরা ভিনজেলা থেকে মালদায় ফেরেন। সরকারি নির্দেশ মেনে ওঁদের হোম কোয়ারান্টিনে থাকার কথা। কিন্তু অভাবের সংসার চালানোই দায়। গ্রামের বাড়িতে আলাদা ঘর বলতে কিছু নেই। তাই হোম কোয়ারান্টিনে থাকা অসম্ভব। পরিবারের কথা ভেবে, দেশের কথা ভেবে, কালিন্দ্রী নদীর ধারে তাঁবু খাঁটিয়ে দিন কাটাচ্ছেন মালদার কয়েকজন শ্রমিক। কোনওক্রমে ১৪ দিন সেখানে কাটিয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন ওই শ্রমিকরা।

এমনই বাস্তবের সঙ্গে মুখোমুখি হতে হয়েছে ইংরেজবাজার ব্লকের কোতুয়ালি গ্রাম পঞ্চায়েতের সতীচড়া গ্রামের কয়েকজন শ্রমিককে। তাঁরা জানান, কয়েকমাস আগে তাঁরা গিয়েছিলেন রেড জোনে থাকা হাওড়া জেলার উলুবেরিয়ার ঋষিপুরে। গত ২৪ মার্চ দেশ জুড়ে লকডাউন ঘোষণা হতেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কাজকর্ম। সেখানেই আটকে পড়েন তারা। আশা ছিল সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ ঘোরালো হতে শুরু করলে তারা ফিরে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রথমে তাঁরা কোতুয়ালি গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। উপপ্রধান ইংরেজবাজারের বিধায়ক নীহাররঞ্জন ঘোষকে অনুরোধ করেন তাঁদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। বিধায়কের উদ্যোগে অবশেষে তাঁরা বাড়ি ফেরেন। বাড়ি ফিরতেই ওই শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া হয় মালদা মেডিকেলে। চিকিৎসকরা তাঁদের পরীক্ষানিরীক্ষা করে হোম কোয়ারান্টিনে থাকার পরামর্শ দেন। এতেই সমস্যায় পড়েন শ্রমিকরা। কারণ, তাদের বাড়িতে আলাদা করে থাকার মতো ব্যবস্থা নেই।

- Advertisement -

কিন্তু সরকারি নির্দেশ মানতেই হবে, তাই তারা তাঁবু খাঁটিয়ে আশ্রয় নেন কালিন্দ্রী নদীর ধারে। সেখানেই কেটে গিয়েছে কয়েকটা দিন। এখন ওরা বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। নদীর ধারে কোয়ারান্টিনে থাকা এক শ্রমিক সিন্টু আলম বলেন, বিধায়ক নীহাররঞ্জন ঘোষের সাহায্যে আমরা জেলায় ফিরে এসেছি। প্রথমেই আমাদের মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করা হয়। আমাদের শরীরে করোনার কোনও উপসর্গ না পাওয়া গেলেও চিকিৎসকরা ১৪ দিনের হোম কোয়ারান্টিনে থাকতে নির্দেশ দেন। কিন্তু আমাদের বাড়িতে আলাদা করে থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই। শুধু আমার নয়, আমরা যারা তাঁবুতে রয়েছি কারোরই বাড়িতে আলাদা ঘর নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমরা নদীর ধারে তাঁবু খাঁটিয়ে রয়েছি। পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন দূর থেকে আমাদের খাবার জল দিয়ে যান। কখনও দিয়ে যান চাল, ডাল, সবজি। আমরা এখানে রান্না করি। এই ভাবে ১৪ দিন কাটিয়ে দিতে পারলে বাড়ি ফিরে যাব আমরা।

আরও এক শ্রমিক বলেন, করোনার থাবা যে এতটা ভয়াবহ রূপ নেবে তা কল্পনাও করতে পারিনি। আমরা স্বেচ্ছায় নদীর ধারে তাঁবু খাঁটিয়ে রয়েছি। কারণ, আমাদের জন্য পরিবারের অন্য সদস্য কিংবা গ্রামের মানুষ বিপদে পড়েন তা চাই না। ইংরেজ বাজারের বিধায়ক নীহাররঞ্জন ঘোষ বলেন, আমাদের রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্যে মালদার বহু শ্রমিক আটকে রয়েছেন। ইতিমধ্যেই ওই শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিয়ে আসার কাজ শুরু হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে। ইংরেজবাজারেরও কয়েকজন শ্রমিক ফিরে এসেছেন। তাঁরা খুব গরিব। বাড়িতে আলাদা ঘর নেই, যেখানে তাঁরা হোম কোয়ারান্টিনে থাকতে পারেন। তাই অনেকেই নদীর ধারে তাঁবু খাঁটিয়ে রয়েছেন। এই ঘটনা শিক্ষনীয়।