জলের দরে বিকোচ্ছে দুধ, ছানার দামে পতন

প্রকাশ মিশ্র, মানিকচক : হাতে তৈরি মিষ্টি থেকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের গুজব এবং দীর্ঘ লকডাউনের ফলে বাজারে মিষ্টির খরিদ্দার উধাও। আর তাই মিষ্টির দোকানগুলির ঝাঁপ কার্যত বন্ধ। ছানার চাহিদা না থাকায় মানিকচকের ভূতনি সহ আশপাশের এলাকায় প্রতি লিটার দুধ বিকোচ্ছে বোতলবন্দি পানীয় জলের দামে, ১৫-২০ টাকা দরে। এক দশকে দুধ ও ছানার দামে এমন পতন দেখা যায়নি। তাই মানিকচকের হাজার হাজার দুধ উৎপাদনকারী, দুধ ও ছানা ব্যবসায়ীর হেঁসেলে এখন করোনা রাহুর গ্রাস। দুবেলা দূরের কথা, এখন একবেলা হাঁড়ি চড়াই দায় হয়ে পড়েছে। অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটছে তাঁদের।

জেলায় প্রায় ষাট শতাংশ দুধ ও ছানার যোগান আসে মানিকচকের ভূতনি সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। লকডাউন চলাকালীন দোকান খোলার সময়সীমা বাড়ানো হলেও গ্রাহকের দেখা নেই। এছাড়া দফায় দফায় মিষ্টির দোকান খোলা বন্ধের নিয়ম পাল্টানোর ফলে সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারছেন না কখন খোলা কখন বন্ধ। তার উপর বাজারে এসে পুলিশের মারের ভয়। তাই খরিদ্দার নেই। মিষ্টির দোকান প্রায় ৮০ শতাংশই বন্ধ। ফলে দুধ ও ছানার চাহিদায় পড়েছে করোনার ছায়া। দুধের চেয়ে ছানার অবস্থা আরও খারাপ। গত এক দশকে ছানার দাম এত নীচে নামেনি। ১৭০-১৮০ টাকা প্রতি কেজির ছানা এখন ৫০-৭০ টাকা কেজি দরে বিকোচ্ছে।

- Advertisement -

ভূতনির আটসোইয়া গ্রামের দুধ ও ছানা বিক্রেতা শ্যামল ঘোষের আক্ষেপ, বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে এই ব্যবসা চলে আসছে। কিন্তু কোনওদিন এই অবস্থা দেখিনি। বাজারে এলে পুলিশের লাঠি খাওয়ার ভয়ে মিষ্টির দোকানে খরিদ্দার নেই। তাই দোকানগুলো একের পর এক ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ছানার আর চাহিদা নেই। কিন্তু আমাদের তো গেরস্থ বাড়ি থেকে দুধ কিনতেই হচ্ছে। কারণ, ভূতনিতে হাজার হাজার পরিবার গোরু-মহিষ পালন করেন। জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ দুধের যোগান হয় এখান থেকে। তাঁদের সঙ্গে আমাদের মতো দুধ সংগ্রহকারী ঘোষদের সারা বছরের অলিখিত চুক্তি থাকে। ওই সব বাড়ির গোরু ও মহিষের দুধ আমরা দুইয়ে নিই। ফলে বাজার থেকে কিছুটা কম দামে পাই। ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি প্রতি আমরা দুধ কিনি।

শ্যামল বলেন, ছানা ফাটিয়ে শহর সহ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করি। কেউ কেউ মিষ্টির দোকানে ছানা সরবরাহ করে থাকে। আমরা চুক্তি করা দামে দুধ না কিনলে লকডাউন উঠে যাওয়ার পরে গোরু বা মোষ পালনকারীরা আমাদের আর দুধ দেবেন না। তাই কিনতে বাধ্য হচ্ছি। অথচ সেই দুধ থেকে ছানা করে যখন বাজারে নিয়ে যাচ্ছি সেই ছানা আর বিক্রি হচ্ছে না। কেননা এখন যানবাহন চলছে না বলে শহরে অতুল মার্কেটস্থিত ছানা মার্কেটে ছানা নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। লকডাউনের ফলে ছানা মার্কেটে এখন ছানার দাম কোনও কোনও দিন ৫০-৬০ টাকা প্রতি কেজিতে নেমে যাচ্ছে। এদিকে খরিদ্দার না থাকায় মিষ্টির দোকানগুলি বন্ধ। ফলে ছানা নিয়ে বেচব কোথায়। তাই বাধ্য হয়ে কেজি প্রতি ৩০-৩৫ টাকায় দুধ কিনে জলের দরে বেচতে হচ্ছে।

মথুরাপুর গোয়ালপাড়ার রতন ঘোষ বলেন, আমাদের অবস্থা খুবই সঙ্গিন। দিনমজুরি করতে পারি না। অন্য কোনও কাজও করতে পারছি না। পারিবারিক দুধের ব্যবসা করে আসছি। দুধ কিনে ছানা করে শহরে এবং বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করতাম। প্রায় আড়াই মাস ধরে তা বন্ধ। এক সময় ছানা ১৮০-২০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন পঞ্চাশ টাকার বেশি বললে কেউ নিতে চাইছে না। লকডাউনে মিষ্টির দোকান বন্ধ। তাই দোকানদাররাও ছানা কিনছে না। আমরা মহা সমস্যায় পড়েছি। মথুরাপুরের এক মিষ্টি ব্যবসায়ী কাজল ঘোষ বলেন, লকডাউনে মানুষ রাস্তায় বেরোচ্ছে না। পুলিশের মারের ভয়ে রাস্তাঘাট শুনসান। দোকানে বিক্রিই তো হচ্ছে না। তাই ছানা নিয়ে কোনও লাভ নেই।

২-৩ টাকা পিস মিষ্টির জন্য বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানের মালিক দীপুনারায়ণ দাস বলেন, কয়েকদিন দোকান খুলেছিলাম। মিষ্টিও তৈরি করলাম। কিন্তু গ্রাহক নেই। মিষ্টির দোকানে কিছু ছাড় দিয়েছিল রাজ্য সরকার। খোলা-বন্ধের সময় বারবার পরিবর্তন হচ্ছে। তাছাড়া লকডাউনের কারণে মানুষ বাইরে বেরোচ্ছেন না। অকারণে বাইরে বেরোলে পুলিশের মার খেতে হচ্ছে। মিষ্টি কিনতে যাচ্ছি, বললে তো কোনও ছাড় নেই। লাঠি খাওয়ার ভয়ে মানুষ মিষ্টির দোকানমুখো হচ্ছেন না। কাঁচামালের জিনিস বেশিদিন রাখা যায় না। কয়েকদিন কর্মচারী কমিয়ে অল্প করে মিষ্টি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু এইভাবে চালানো যাচ্ছে না। কেননা কর্মচারীদের বেতন, খরচপত্র বাদ দিলে উলটে নিজের থেকে টাকা লাগাতে হচ্ছে। ফলে দোকান বন্ধ রেখেছি। মিষ্টি তৈরি করে তো রাখা যায় না। তাই ছানা কিনে আর কী করব?

মথুরাপুরের আরেক মিষ্টি ব্যবসায়ী জয়সীমা প্রামাণিক বলেন, লকডাউনের কারণে দুপুরের পর থেকে রাস্তাঘাট শুনসান হয়ে যায়। দুপুর ১২টার পরেই দোকান বন্ধ। তাহলে মিষ্টি বিক্রি হবে কখন? তাই ছানা কিনে লাভ নেই। কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে প্রায় হাজার দশেক টাকা খরচ। এদিকে আয় হচ্ছে না কিছুই। তাই দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। লকডাউনের জেরে এবং করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় মিষ্টিশিল্পীদের এখন করুণ অবস্থা। এর প্রভাব পড়েছে ছানা ও দুধের ওপরেও। এই দশা কবে কাটবে এখন সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন দুধ-ছানা উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা।