গরু পাচারের জন্য খোঁয়ার নিলামের দর উঠছে লক্ষ লক্ষ টাকা

618
প্রতীকী ছবি।

গৌতম সরকার,মেখলিগঞ্জ: গরুর খোঁয়ার পরিচালনার দায়িত্ব পেতে মরিয়া হয়ে উঠছেন এক শ্রেণীর মানুষ। কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ ব্লকের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে গত কয়েকবছর থেকে এমনটাই খবর শোনা যাচ্ছে। এমনকী, সম্প্রতি এই সীমান্ত এলাকায় একটি খোঁয়ার নিলামের সময় তার দর পঞ্চান্ন লক্ষ টাকা অবধি উঠেছিল। যা নিয়ে সোস্যাল মিডিয়াতেও ঝড় উঠেছিল। যদিও আসলে কত টাকায় খোঁয়ারটি নিলাম হয়েছিল সেইবিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। কারণ, সকলেই মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, খোঁয়ার নিলামের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা দর উঠলেও বাস্তবে সেই টাকা সরকারি হিসেবে দেখানো হয় না। এটা হয় আলোচনার মাধ্যমে। যে যত টাকা দেবেন খোঁয়ার নাকি পাওয়ার ক্ষেত্রে তার তত বেশি সুবিধা হবে। তবে সরকারি নথিপত্রে নাকি বহু মূল্যে খোঁয়ার নিলামের তথ্যের কোনও প্রমাণই মিলবে না। কিন্তু সীমান্ত এলাকায় কেন খোঁয়ারের দর লক্ষ লক্ষ টাকা উঠছে? এত কী লাভ এতে? এইসব নানা প্রশ্ন উঠে আসছে বিভিন্ন মহল থেকে।

এই ঘটনা ইতিমধ্যেই খবর পৌঁছেছে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলির তরফেও এবিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর। জানা গিয়েছে, এবিষয়ে প্রশাসনের কাছেও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পৌঁছেছে। তারা জানতে পেরেছেন, সীমান্তে গরু উদ্ধারের পর সেগুলি বিএসএফ ও পুলিশ হয়ে নির্দিষ্ট খোঁয়ারে পৌঁছায়। তারপর নিলাম হয়। কিন্তু অভিযোগ বিভিন্ন খোঁয়ার থেকে উদ্ধার হওয়া গরু বাংলাদেশ পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়। খোঁয়ারে গরু লালন পালনের জন্য সরকারের তরফে নির্দিষ্ট খরচ দেওয়া হয়ে থাকে। অভিযোগ, খোঁয়ারের গরু বাংলাদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার পর খোঁয়ারে গরু না থাকলেও কিংবা যত সংখ্যক গরু থাকার কথা তার চাইতে অনেক কম গরু থাকলেও এই গরু পালনের নামে মাসের পর মাস একটি চক্র সরকারের কাছ থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন।

- Advertisement -

আরও অভিযোগ, প্রায়ই কিছু খোঁয়ারের গরু মারা যাচ্ছে বলে হিসেব দেখানো হচ্ছে। অর্থাৎ ছোট গরু বাছুর হয়ে যাওয়া, মজুত করা গরু বাংলাদেশে পাচার, মৃত গরু, গরুর দেখভালের জন্য টাকা তুলে নেওয়া ইত্যাদি নানা অভিযোগ সীমান্তের খোঁয়ারের একাংশের বিরুদ্ধে উঠে আসছে। যা নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যও ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ এইভাবে গরুকে কেন্দ্র করে এখানে কোটি কোটি টাকার খেলা চলছে। শুধু অভিযোগ ওঠাই নয়। এবিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে। তার পরেই এনিয়ে গোপনে খোঁজ খবর শুরু হয়েছে। তবে এর পিছনে বড় ধরণের হাত এবং বাইরের মাফিয়াদের যোগ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠে আসছে গরুর কারবারিদের কোটি কোটি টাকা কীভাবে ভারতে পৌঁছে যাচ্ছে এটা নিয়েও। বড় প্রশ্ন উঠেছে খোঁয়ারের গরু মারা যাওয়ার ঘটনা নিয়েও। গোটা প্রক্রিয়াটির পিছনে একটি চক্র সুকৌশলে দিনের পর দিন কাজটি করে আসছেন। এতে প্রশাসনেরও একটি অংশ সরাসরি জড়িত রয়েছেন বলেই চক্রটির রমরমা কারবার চলছে বলে সন্দেহ। তাদের মদতেই নথিপত্রও মিলিয়ে রাখা হচ্ছে। যাতে বিষয়টি কেউ আন্দাজই করতে না পারেন। প্রমাণ দূরের কথা। ব্লকে কতগুলি খোঁয়ার রয়েছে এই হিসেব নাকি নেই মেখলিগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতি এবং প্রশাসনের অনেক মহলেই।

মেখলিগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির প্রাণী কর্মাধক্ষ্য বাবুল হোসেন বলেন, “খোঁয়ার থেকে এত গরু মরার ঘটনাটি তাকেও দারুণ ভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। গরু মজুতের হিসেব নিয়েও গরমিল রয়েছে বলে তার কাছেও বারবার অভিযোগ আসছে। কয়েকটি খোঁয়ারে গিয়ে কিছু অভিযোগ তার কাছে অনেকটাই সত্যও মনে হয়েছে। গোটা বিষয়ের তদন্তের দাবি করেছেন। সঠিক তদন্ত হলে অনেকের মুখোশ খুলে যেতে পারে বলেও তিনি মনে করছেন। তবে ব্লকে কতগুলি খোঁয়ার রয়েছে। এখনও কত গরু নিলামের অপেক্ষায়, এইসব কোনও তথ্য তিনি দিতে পারেননি। তারই বক্তব্য এইসব তথ্য চেয়েও মিলছে না। একাংশ সব আড়ালের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

মেখলিগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নিয়তি সরকার বলেন, “গরুর কারবার নিয়ে অনেকদিন থেকেই বহু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে আসছে। অনেকেই তার কাছে অভিযোগ করেছেন, সঠিকভাবে তদন্ত হলে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ কারবারের হদিস মিলতে পারে। তিনিও চাইছেন রহস্যের উন্মোচন হোক। এইসব নিয়ে বহু অভিযোগ রয়েছে। তাই এসবের সঠিক তদন্তের দাবি করেছেন পঞ্চায়েত সমিতির বিদ্যুৎ কর্মাধক্ষ্য বাপী চক্রবর্তীও।

জানাগিয়েছে, গরু মার্কিং, দর নির্ধারণ, নিলাম এইসব কাজের প্রক্রিয়ায় প্রাণী স্বাস্থ্যদপ্তর, পুলিশ, ব্লক প্রশাসন, পঞ্চায়েত সমিতিরও ভূমিকা রয়েছে। তবে খোঁয়ারে এত গরু মরার বিষয়টি নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এনিয়ে জানতে মেখলিগঞ্জ ব্লকের বিএলডিও ডাঃ দেবাশীষ বর্মনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও ফোন ধরেননি। মেসেজেরও কোনও উত্তর দেননি। জানাগিয়েছে, মৃত গরুর ডেথ সার্টিফিকেট ব্লক প্রাণী স্বাস্থ্যদপ্তর থেকে দেওয়া হয়। এটা নিয়েও প্রশ্ন-অভিযোগ রয়েছে। মেখলিগঞ্জ সীমান্তের গরুর কারবার সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে কোচবিহারের জেলা শাসক পবন কাদিয়ান জানিয়েছেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।