আঠারো হয়নি, বিয়েতে নারাজ ধন্যি মেয়েরা

সৌরভ রায় বিধান ঘোষ, কুশমণ্ডি হিলি : বয়স আঠারোর গণ্ডি পেরোয়নি। বন্ধুদের সঙ্গে খুনশুটি করে সময় কাটছে বেশ। শ্যামবর্ণা মেয়েটির মনে অনেক স্বপ্ন ঘুরপাক খায়। বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ভাবনা তাড়া করে ছোট থেকেই। কিন্তু কুশমণ্ডির প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েটির মাথায় আচমকাই যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। তার অমতেই বাড়ির লোকজন বিয়ে পাকা করে দেয়। এমনকি বিয়ে দিতে উদ্যোগীও হন মা-বাবা। কিন্তু মেয়ে যে লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে চায়। তাই মা-বাবার সঙ্গে সহমত হতে পারেনি সে।

মনস্থির করে ফেলে কুশমণ্ডির স্কুল পড়ুয়াটি, বিয়ে এখন করবে না। এখনও যে সে বিয়ে করতে রাজি নয়, সেই কথা স্কুলের কন্যাশ্রী ক্লাবের সহপাঠীদের জানিয়ে দেয় সে। ব্যাস, তাতেই কাজ হয়ে যায় অনেকটা। শুক্রবার সন্ধ্যায় বিয়ে করতে আসবে পাত্র। সমস্ত জোগাড় শেষ। তবে তার আগেই পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাদের কানে নাবালিকা বিয়ে খবর পৌঁছে দেয় কন্যাশ্রী ক্লাব। বুধবার দুপুরে হঠাৎ ব্লক প্রশাসন ও পুলিশ আধিকারিকরা ওই নাবালিকার বাড়িতে হানা দেন। বিয়ে বাড়িতে পুলিশ দেখে ঘাবড়ে যান মেয়ের বাবা। নাবালিকার বিয়ে দেওয়া যে অপরাধ, তা জানতে পেরে অবশেষে মত বদলান তিনি। মুচলেকা দিয়ে জানিয়ে দেন, মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হলে তিনি আর বিয়ে দেবেন না। মেয়ের অমতেই বিয়ের জন্য পরিবার থেকে জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের শত চাপেও অন্যায় মেনে নিতে পারেনি ওই নাবালিকা। শুরু হয় নিঃশব্দ অভিযান। মেয়েটি সব কথা জানিয়ে সাহায্য চায় বিদ্যালয়ে কন্যাশ্রী ক্লাবে।

- Advertisement -

কুশমণ্ডির পরমেশ্বরপুর উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিখিলকুমার হালদার জানান, পরিবারের তরফে গোপনে নাবালিকার বিয়ে ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু বিয়েছে রাজি ছিল না মেয়েটি। বিয়ে করবে না বলে বাড়ি ছেড়ে বান্ধবীর বাড়িতেও কাটিয়েছে কয়েকদিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবারের চাপে বিয়েছে রাজি হতে হয় তাকে। তবে বিয়েতে রাজি হলেও মেয়েটি সব কথা জানিয়ে সাহায্য চায় বিদ্যালয়ে কন্যাশ্রী ক্লাবে। কন্যাশ্রী ক্লাবের সদস্যদের মারফত বিষয়টি জানতে পেরে নাবালিকার বিয়ে বন্ধের জন মেল মারফত আবেদন জানানো হয় কুশমণ্ডির বিডিওর কাছে। এদিন দুপুরে কন্যাশ্রী ব্লক আধিকারিক এবং বিডিওর প্রতিনিধি পৌঁছে যান নাবালিকার বাড়িতে। এগিয়ে আসেন কুশমণ্ডি থানার আইসি মানবেন্দ্র সাহা। শুক্রবার সন্ধ্যায় বিয়ে করতে আসবে পাত্র। তাই আয়োজনে কোনও খামতি ছিল না মেয়ের বাড়িতে। তবে এদিন দুপুরে ব্লক প্রশাসনের আধিকারিক ও পুলিশকে বাড়িতে আসতে দেখে ঘাবড়ে যায় বাড়ির লোকজন। শেষে মুচলেকা দিয়ে মেয়ে বাবা জানিয়ে দেন, মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হলে বিয়ে দেবেন না। কন্যাশ্রী ক্লাবের সকল সদস্য সহ স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিখিলকুমার হালদারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কুশমণ্ডির বিডিও শৈপা লামা। মহকুমা শাসক মানবেন্দ্র দেবনাথ জানান, বিদ্যালয়ের কন্যাশ্রী ক্লাব তৈরির সার্থকতা এখানেই। নাবালিকা সহপাঠীর বিয়ে বন্ধের এই কর্মকাণ্ড বাকি সকলের জন্য উৎসাহ জোগাবে বলে আশা করছি।

এদিকে মঙ্গলবার রাতে হিলিতে নাবালিকার বিয়ে রুখে দিয়েছে চাইল্ডলাইন ও পুলিশ-প্রশাসন। হিলির পাঞ্জুল এলাকায় ১৭ বছরের এক নাবালিকার বিয়ে ঠিক হয়েছিল ইসমাইলপুরে। ঘটনার খবর পাওয়া মাত্র হানা দেয় চাইল্ডলাইন, পুলিশ ও বিডিওর একটি প্রতিনিধিদল। ঘটনাস্থলে গিয়ে পাত্র ও পাত্রীপক্ষের নথিপত্র দেখা হয়। তারপরেই বিয়ে বন্ধ করে দেন প্রশাসনিক আধিকারিকেরা। বাবা-মার কাছ থেকে ১৮ বছর না হলে মেয়ের বিয়ে দেবেন না বলে মুচলেকা লিখিয়ে নেওয়া হয়। চাইল্ডলাইনের কাউন্সিলর রিতা মাহাতো জানান, সূত্র মারফত খবর পাই ওই এলাকায় নাবালিকার বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তড়িঘড়ি মেয়েটির বাড়িতে যাই আমরা। তার পরিবারকে বুঝিয়ে মুচলেকা লিখিয়ে বিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। হিলির বিডিও সৌমেন বিশ্বাস বলেন, খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে বিয়েটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিবারের তরফে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহ রোধে প্রশাসন কড়া নজরদারি চালাচ্ছে।