বেহাল সড়ক, অপ্রতুল রেল উন্নয়নের প্রতিবন্ধক

629

জ্যোতি সরকার: যে কোনও এলাকার উন্নয়নের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হল সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থার হাল। আগামী ১৫ অগাস্ট এলে দেশের স্বাধীনতার ৭৩ বছর পূর্ণ হয়ে যাবে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিন্তু উত্তরবঙ্গ পিছিয়ে থাকল। সম্ভাবনার অনেক উজ্জ্বল দিক থাকা সত্ত্বেও কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রত্যাশিত উন্নয়ন হযনি গঙ্গার উত্তর পাড়ের এই অঞ্চলে। কংগ্রেস আমলে খগেন দাশগুপ্ত পূর্তমন্ত্রী থাকাকালীন উত্তরবঙ্গের রাস্তাঘাটের উন্নয়নে কিছু কাজ হয়েছিল বলে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরাও স্বীকার করেন। বাম আমলে দীর্ঘদিন পূর্তমন্ত্রী ছিলেন যতীন চক্রবর্তী।

পরবর্তীতে এই দায়িত্ব পালন করেন মতীশ রায়, ক্ষিতি গোস্বামী, অমর চৌধুরীরা। ঢাকুরিয়া কেন্দ্র থেকে জয়ী হলেও ক্ষিতিবাবু আদতে বালুরঘাটের মানুষ। উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তিনি আন্তরিক হলেও প্রত্যাশিত বাজেট বরাদ্দ না হওয়ায় তেমন পরিবর্তন করতে পারেননি। সময়ে ব্যবধানে পূর্ত দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার মনোহর তিরকি এবং দশরথ তিরকি দায়িত্ব পালন করেছেন বটে। দুর্ভাগ্য হল, পলিসি মেকিংয়ে ক্ষেত্রে এই দু’জনের কেউই তেমন দাগ কাটতে পারেননি। উত্তরবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ করার একটি উদাহরণ তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

- Advertisement -

ফালাকাটা-শিলবাড়ি রোডে শিলতোর্ষা নদীর ওপর পাকা সেতু নির্মাণের  দাবিতে পলাশবাড়ির সমাজসেবী ডাঃ শম্ভুনাথ পালের নেতৃত্বে একসময় দীর্ঘদিন আন্দোলন হয়েছে। বিস্মযকর হলেও সত্যি যে, শিলতোর্ষা নদীর ওপর সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর তিনবার স্থাপিত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ, সেতু নির্মাণের কৃতিত্ব নিয়ে দুই বাম শরিক সিপিএম এবং আরএসপির মধ্যে বিচিত্র প্রতিযোগিতা। দীর্ঘ তিন দশকে এই ধরনের নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে শিলতোর্ষায় অবশেষে পাকা সেতু তৈরি হয়েছিল।

পরে সংশ্লিষ্ট স্টেট হাইওয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, মহাসড়ক নির্মাণের কাজ ২০১৬ থেকে শুরুও হয়। কিন্তু কবে কাজ শেষ হবে, তা এখন বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নের নীচে লুকিয়ে প্রথমে ছিল জমিজট। সেই সমস্যা কাটাতে জল গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। জমিজটের নিষ্পত্তি তো হল। এরপর সম্প্রতি লকডাউন বিরূপ প্রভাব ফেলেছে মহাসড়ক নির্মাণের ওপরে। ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার প্রোজেক্ট ডিরেক্টর প্রদ্যুৎ দাশগুপ্তের বক্তব্য অনুযায়ী, শিলিগুড়ির কাছে ঘোষপুকুর থেকে আলিপুরদুযার পেরিয়ে অসম যাওয়ার পথে সলসলাবাড়ি পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণ শেষ করতে ন্যূনতম আরও দু’বছর সময় লাগবে।

একদিকে পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাব, অপরদিকে প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা-যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর বরাবর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে উত্তরবঙ্গে।

সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার হাল উত্তরবঙ্গের ৮ জেলাতে বড়ই করুণ দশায় আছে। সর্বত্র রাস্তাঘাট খানাখন্দে ভরা। বর্ষার সময় প্রতি বছর সড়ক যোগাযোগ মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়। দীর্ঘ ৩৪ বছর বামফ্রন্টের শাসন ছিল রাজ্যে। বর্তমানে মা-মাটি-মানুষের সরকার ৯ বছর ক্ষমতাসীন। বাম জমানার আগে কংগ্রেস সরকারের আমলে পরিকল্পনার সিংহভাগই মহানগর এবং মহানগর সংলগ্ন জেলাগুলিকে কেন্দ্র করে হয়েছে। রাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের শপথ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, মহাকরণের অলিন্দে বসে তাঁরা সরকার পরিচালনা করবেন না। সমবিকাশের লক্ষ্যে সরকার পরিচালিত হবে।

বাম আমলে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে গ্রামীণ রাস্তাঘাটের উন্নতি হয়েছে বললে নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু সার্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাব ছিল। যার পরিণতিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উত্তরবঙ্গকে উন্নয়নের দিক থেকে এখনও পিছিয়ে রেখেছে। বাম মন্ত্রীসভায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক নির্মল বসু, ননী ভট্টাচার্য, কমল গুহ, দীনেশ ডাকুয়া, শৈলেন্দ্রনাথ সরকার, অশোক ভট্টাচার্যের মতো উত্তরবঙ্গের জনপ্রতিনিধিরা। তাঁরাও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজ্য মন্ত্রীসভায় তেমন উদ্যোগী হননি কখনও। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শিলতোর্ষার পাশাপাশি ময়নাগুড়িতে জরদা নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু হয়েছে।

সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসাধনের লক্ষ্যে তেঁতুলিয়া করিডরের দাবি দীর্ঘদিনের। লোকসভায় সাংসদ থাকাকালীন অমর রায়প্রধান এ ব্যাপারে অনেকবার সরব হয়েছেন। আবার জিতেন দাস, মিনতি সেন, মহেন্দ্র রায় প্রমুখও সাংসদ হয়ে এ ব্যাপারে কেন্দ্রের কাছে বারবার দরবার করেছেন। কেন্দ্রের পূর্বতন কংগ্রেস সরকার এ ব্যাপারে কখনও সদর্থক পদক্ষেপ করেনি। বিজেপি সরকারও এখনও পর্যন্ত উদ্যোগী নয়। অথচ উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশের তেঁতুলিয়াকে ব্যবহার করে করিডর করা হলে উত্তরবঙ্গের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তো বটেই, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত খুলে যেত। চোপড়া থেকে ৮৫ কিলোমিটার কম পথ অতিক্রম করে তেঁতুলিয়া করিডরের মধ্য দিয়ে তিস্তা সড়ক সেতুতে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হত এর ফলে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু জ্বালানি সাশ্রয় হবে না, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গেও সড়ক যোগাযোগে প্রভত উন্নতি হবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের স্বার্থে দহগ্রাম-আংরাপোঁতায় যাতায়াতের জন্য ভারত তিনবিঘা করিডর দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে তেঁতুলিয়া করিডর নির্মাণের কোনও চেষ্টা এখনও পর্যন্ত হয়নি। শুধু সড়কপথ নয়, উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ ও বিমান পরিষেবা নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভ মোটেই অসঙ্গত নয়। শিয়ালদা ও হাওড়া স্টেশনের মাধ্যমে কলকাতা ও লাগোয়া দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলা লোকাল ট্রেনের পরিষেবা পায়। সেই পরিষেবা উত্তরবঙ্গে কোথায়? জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি রুটে একটিমাত্র লোকাল ট্রেন।

অন্য জেলাগুলির মধ্যে লোকাল ট্রেনের তেমন বালাই নেই। কোচবিহার-শিলিগুড়ি কিংবা আলিপুরদুয়ার-শিলিগুড়ি কিছু ট্রেন থাকলেও তার সময়সারণি এমন যে, তাতে তেমন পরিষেবা মেলে না। আলিপুরদুয়ার থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত একটি লোকাল ট্রেন একসময় এলাকার ঐতিহ্য ছিল। রেল কর্তৃপক্ষ প্রায় চার দশকের বেশি হল সেই ট্রেনটি বাতিল করে দিয়েছে। প্রান্তিক এলাকা বক্সাদুয়ার, সানতালাবাড়ি, জয়ন্তী এলাকার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম বড় মাধ্যম ছিল এই ট্রেনটি। উত্তরবঙ্গকে চক্ররেল পরিষেবার আওতায় আনার দাবি দীর্ঘদিনের। কেন্দ্রের কোনও সরকারই এই দাবির প্রতি কর্ণপাত করেনি।

অথচ ভৌগোলিক দিক থেকে উত্তরবঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী ভুটান, নেপাল এবং বাংলাদেশ উত্তরবঙ্গের লাগোয়া। সীমান্ত এলাকা হিসাবে উন্নয়নের দিক থেকে উত্তরবঙ্গের প্রাধান্য পাওয়া উচিত। উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতাগামী ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধির দাবি বারবার করা হলেও তা মান্যতা পাযনি। দার্জিলিং মেল, তিস্তা-তোর্ষা এক্সপ্রেস, উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, পদাতিক এক্সপ্রেসের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের রেলযাত্রীদের বিপুল চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। সবসময়ই টিকিটের বিপুল চাহিদা থাকে। অথচ যাত্রী অনুপাতে কলকাতাগামী ট্রেনের সংখ্যা কম। সমীক্ষা করলেই বাস্তব এই চিত্রটি সহজেই ধরা পড়বে। শুধু কলকাতাগামী নয, দিল্লি এবং দক্ষিণ ভারতগামী ট্রেনের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা প্রযোজন। চিকিত্সার তাগিদে উত্তরবঙ্গের বহু মানুষ দক্ষিণ ভারতে যান। রোগী নিয়ে যাওযার ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা বড় অন্তরায হয়ে থাকে সবসময়ই। জরুরি প্রয়োজনে বিমান পরিষেবা ব্যবহারেরও তেমন সুযোগ নেই উত্তরবঙ্গের সব প্রান্তে।

উত্তরের আট জেলার মধ্যে সাতটি জেলাই বিমান মানচিত্রের বাইরে। বাগডোগরায় বায়ুসেনার নিয়ন্ত্রণাধীন একটিমাত্র বিমানবন্দর ছাড়া অন্য কোথাও উড়ান ওঠানামার ব্যবস্থা নেই এখন। অথচ কোচবিহার এবং মালদায় বিমানবন্দর পড়ে আছে। অনেকবার ওই বিমানবন্দরগুলি চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরিস্থিতির বদল হয়নি। জলপাইগুড়ি থেকেও দীর্ঘদিন বিমান চালুর দাবি রয়েছে। বিমানবন্দরের জন্য জমিও আছে। কিন্তু সেই দাবির নথি ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন। উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে গতি আনার স্বার্থে কাজের তদারকি করার লক্ষ্যে ক্ষমতায় এসেই তণমূল সরকার উত্তরকন্যা ভবন নির্মাণ করেছিল শিলিগুড়ির কাছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের প্রত্যাশাপূরণ এখনও হয়নি। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেমন প্রযোজন পাশাপাশি, এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজ্য সরকারেরই এগিয়ে আসা উচিত।